প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হলিউড অভিনেতা অ্যালেক বল্ডউইন-এর জন্য ‘রাস্ট’ সিনেমার সেটে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার আইনি জটিলতা যেন শেষই হচ্ছে না। প্রায় পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা তাকে বারবার ফিরিয়ে আনছে আদালতের কাঠগড়ায়। এবার একটি দেওয়ানি মামলায় তাকে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস-এর একটি আদালত, যা এই বহুল আলোচিত ঘটনার নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে।
শুক্রবার আদালতের বিচারক এই নির্দেশ দেন, যেখানে বলা হয়েছে—মামলাটি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত এবং পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রক্রিয়ায় যাওয়ার মতো উপাদান এতে রয়েছে। এই মামলাটি দায়ের করেছেন ‘রাস্ট’ ছবির সেটে কাজ করা গ্যাফার সার্জ স্বেতনয়। তিনি অভিযোগ করেছেন, ২০২১ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে তিনি গভীর মানসিক আঘাত ও ট্রমার মধ্যে রয়েছেন, যার জন্য তিনি বল্ডউইনকে দায়ী করছেন।
ঘটনাটি ঘটে ২০২১ সালের ২১ অক্টোবর, যখন নিউ মেক্সিকোতে ‘রাস্ট’ সিনেমার শুটিং চলছিল। একটি দৃশ্যের অনুশীলনের সময় বল্ডউইনের হাতে থাকা একটি রিভলভার থেকে হঠাৎ গুলি বেরিয়ে যায়। সেই গুলিতে নিহত হন সিনেমাটোগ্রাফার হ্যালিনা হাচিন্স, যিনি তখন ক্যামেরার পেছনে কাজ করছিলেন। ঘটনাটি মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং চলচ্চিত্র জগতে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
স্বেতনয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, গুলিটি খুব কাছাকাছি দিয়ে তাকে অতিক্রম করে, যা তাকে গভীর মানসিক আঘাত দেয়। তিনি দাবি করেন, এই ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং এখনও সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার মতে, সেটে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি, যা এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।
এই মামলায় বিচারক মরিস লাইটার তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, একজন অভিনেতা হিসেবে বল্ডউইনের দায়িত্ব ছিল সেটে ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষয়ে সচেতন থাকা। তিনি বলেন, ট্রিগারে আঙুল রেখে বন্দুক তাক করার মতো আচরণ অন্যদের মধ্যে ভয় বা মানসিক কষ্ট সৃষ্টি করতে পারে—এমনটি অনুমান করা অযৌক্তিক নয়। এই যুক্তির ভিত্তিতেই তিনি বল্ডউইনের দায়মুক্তির আবেদন খারিজ করে দেন এবং মামলাটিকে পূর্ণাঙ্গ বিচারের জন্য অনুমোদন দেন।
তবে শুরু থেকেই বল্ডউইন দাবি করে আসছেন যে তিনি ট্রিগার চাপেননি এবং ঘটনাটি একটি দুর্ঘটনা। তার আইনজীবীরাও বারবার এই দাবি তুলে ধরেছেন যে, সেটে ব্যবহৃত অস্ত্রটি নিরাপদ হিসেবে যাচাই করা হয়েছিল এবং বল্ডউইন সেই তথ্যের ওপরই নির্ভর করেছিলেন। ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অনিচ্ছাকৃত নরহত্যার ফৌজদারি মামলাটি আদালত খারিজ করে দেয়, যেখানে প্রসিকিউশন পক্ষের তথ্য গোপনের অভিযোগ সামনে আসে।
এই রায়ে বল্ডউইন সাময়িকভাবে ফৌজদারি দায় থেকে মুক্তি পেলেও, নতুন এই দেওয়ানি মামলা তাকে আবারও আইনি লড়াইয়ে টেনে এনেছে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ও মানসিক ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়, যা এই মামলাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
অন্যদিকে, ‘রাস্ট’ ছবির অস্ত্রাগার তত্ত্বাবধায়ক হান্না গুতিয়ারেজ-কে এরই মধ্যে দোষী সাব্যস্ত করে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেই দণ্ড ভোগ করে ইতিমধ্যে মুক্তি পেয়েছেন। এই দণ্ডাদেশ চলচ্চিত্র সেটে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং দায়িত্ববোধের অভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।
হ্যালিনা হাচিন্সের মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলাগুলো আগেই আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। তবে স্বেতনয়ের এই মামলাটি আলাদা, কারণ এটি সরাসরি মানসিক ক্ষতির দাবি নিয়ে করা হয়েছে এবং এতে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।
এই নতুন আইনি প্রক্রিয়া শুধু বল্ডউইনের ব্যক্তিগত জীবনে নয়, বরং পুরো চলচ্চিত্র শিল্পেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে সেটে নিরাপত্তা, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনার পর থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে নিরাপত্তা নীতিমালা আরও কঠোর করা প্রয়োজন।
হলিউডের মতো একটি বড় শিল্পে প্রতিটি শুটিং সেটে শত শত মানুষ কাজ করেন। সেখানে একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ‘রাস্ট’ সেটের এই ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। একজন অভিনেতা, পরিচালক বা প্রযুক্তিকর্মী—সবারই দায়িত্ব রয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার, যা এই মামলার মাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে।
বর্তমানে বল্ডউইনের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এই নতুন রায়ের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তারা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মামলাটি এখন পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রক্রিয়ায় গেলে দীর্ঘ সময় ধরে এটি চলতে পারে এবং নতুন নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘রাস্ট’ ছবির সেই এক মুহূর্তের দুর্ঘটনা এখনো থামেনি। এটি যেন এক দীর্ঘ আইনি অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি নতুন মোড় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এই মামলার চূড়ান্ত ফলাফল শুধু বল্ডউইনের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং চলচ্চিত্র শিল্পে নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধের মানদণ্ডও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।