খেলাপি ঋণে লাগাম টানতে কঠোর পথে ব্যাংক খাত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৮ বার
খেলাপি ঋণে লাগাম টানতে কঠোর পথে ব্যাংক খাত

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার করতে নজিরবিহীন কিছু কঠোর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ বা এবিবি। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন চাওয়ার পাশাপাশি আদালতের স্থগিতাদেশের সুযোগ সীমিত করা, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বন্ধকি সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া সহজ করার মতো একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে পাঁচ ধাপে সাজানো এসব প্রস্তাব সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে। জানা গেছে, খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কী ধরনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে সাম্প্রতিক এক বৈঠকে ব্যাংকগুলোর এমডিদের কাছ থেকে লিখিত মতামত চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় এই প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। যদিও ব্যাংকারদের দাবি, ডিসেম্বর শেষে এই হার কিছুটা কমে প্রায় ৩০ শতাংশে নেমেছে, তবে ওই সময়ের চূড়ান্ত ও বিস্তারিত হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। মাত্র এক বছর আগেই, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা দ্বিগুণেরও ঊর্ধ্বে।

ব্যাংকাররা মনে করছেন, এই উচ্চহারের খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংক খাতের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বহু ‘লুকানো’ বা পুনঃতফসিলের আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ সামনে আসছে, যা অতীতে নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে এবিবির অন্যতম আলোচিত প্রস্তাব হলো খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমতি দেওয়া। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সামাজিক চাপ ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হলে অনেক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঋণ পরিশোধে বাধ্য হবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে বিদ্যমান আইনের আওতাতেই এই ধরনের তালিকা প্রকাশের অনুমোদন দিতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ রাখা আছে। ইতোমধ্যে ঋণখেলাপিদের জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যদিও অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে খেলাপিদের অংশগ্রহণ বিষয়ে আইনে এখনো স্পষ্ট কোনো বিধান নেই।

এবিবির প্রস্তাবনায় প্রথম ধাপে তাৎক্ষণিকভাবে খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে আংশিক অবলোপনের সুবিধা দেওয়া, লিয়েনকৃত শেয়ার দ্রুত নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে সুদ মওকুফের প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকারদের মতে, মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিল অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া শিথিল করা গেলে দ্রুত ঋণ আদায় সম্ভব হবে।

দ্বিতীয় ধাপে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের অর্থ পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করতে আরও কড়া ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক বা আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশ এবং যেকোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে খেলাপি হওয়া শুধু আর্থিক নয়, সামাজিক ও পেশাগত ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তৃতীয় ধাপে বন্ধকি সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে ঋণ আদায় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিলামে বিক্রি হওয়া সম্পদের ওপর আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার, ক্রেতাদের জন্য কর রেয়াত, জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দ্রুত হস্তান্তরের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতেও জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্ন করা এবং আদালতের মাধ্যমে ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তর হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়েছে।

পরবর্তী ধাপে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা সহজ ও রায় দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দাবি, ঋণগ্রহীতা ও জামানতদাতাদের আর্থিক ও সম্পদসংক্রান্ত তথ্য আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই দ্রুত পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। পাশাপাশি উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ডাউনপেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, সিআইবি প্রতিবেদন নিয়ে স্থগিতাদেশের সুযোগ বাতিল এবং অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিত করার কথাও বলা হয়েছে।

সবশেষ ধাপে নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়া ঠেকাতে কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ, বন্ধকি সম্পদের জন্য আলাদা ডেটাবেজ তৈরি এবং সিআইবি ডেটাবেজের মতো সহজ যাচাইব্যবস্থা চালু করা। ব্যাংকাররা মনে করছেন, ঋণ দেওয়ার সময় সম্পদের প্রকৃত মূল্য ও অবস্থান যাচাই নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

চিঠির সমাপনীতে এবিবি আশা প্রকাশ করেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে। প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ আদায় ত্বরান্বিত হবে এবং দীর্ঘদিনের সংকটে থাকা ব্যাংক খাত ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কঠোর প্রস্তাবগুলোর কোন কোনটি কীভাবে বাস্তবায়নের পথে এগোয় এবং তাতে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত