গর্ভেই সন্তান হারানোর যন্ত্রণা, নীরব শোক ভেঙে বললেন রানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৯ বার
গর্ভেই সন্তান হারানোর যন্ত্রণা, নীরব শোক ভেঙে বললেন রানি

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বলিউডে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন রানি মুখার্জি। শক্তিশালী অভিনয়, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উপস্থিতি আর চরিত্র বাছাইয়ের সাহসী সিদ্ধান্তের কারণে তিনি বরাবরই আলাদা। কিন্তু পর্দার আড়ালে একজন নারী, একজন মা হিসেবে তাঁর জীবন যে কতটা সংবেদনশীল ও বেদনাদায়ক অধ্যায় পেরিয়েছে, তা এতদিন অজানাই ছিল। নতুন বছর শুরুর আগমুহূর্তে মুক্তি পাওয়া তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত ছবি ‘মার্দানি ৩’-এর প্রচারের মাঝেই সেই নীরব শোকের কথা প্রথমবার প্রকাশ্যে আনলেন রানি মুখার্জি।

শুক্রবার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ‘মার্দানি’ ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় কিস্তি। নারী পুলিশ কর্মকর্তার দৃঢ়তা ও ন্যায়বোধের গল্প নিয়ে নির্মিত এই সিরিজের প্রতিটি পর্বেই রানি মুখার্জি দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু এবারের মুক্তি তাঁর কাছে শুধু আরেকটি সিনেমার সাফল্য নয়; বরং জীবনের গভীর এক ক্ষতকে স্মরণ করার উপলক্ষও হয়ে উঠেছে। কারণ এই ছবির কাজ শুরু করার কয়েক বছর আগে তিনি হারিয়েছেন গর্ভে থাকা নিজের দ্বিতীয় সন্তানকে।

রানি মুখার্জি জানিয়েছেন, ২০২০ সালে অতিমারির ভয়াবহ সময় তিনি দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন। চারদিকে তখন অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর মৃত্যুর খবর। তার মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবনে আসে সবচেয়ে বড় আঘাত। পাঁচ মাসের মাথায় তাঁর গর্ভপাত হয়। যে সন্তানকে ঘিরে স্বপ্ন, অপেক্ষা আর মাতৃত্বের প্রস্তুতি চলছিল, সে সন্তান আর পৃথিবীর আলো দেখেনি। অভিনেত্রীর ভাষায়, সেই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি।

এই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর কাছে আসে ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবির প্রস্তাব। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে একজন মায়ের সন্তানের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ের গল্প বলা হয়েছে। দেবিকা চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে রানি জানতেন, এটি মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন একটি চরিত্র। তবু তিনি কাউকে জানাননি যে তিনি সদ্য নিজের সন্তানকে হারিয়েছেন। পরিচালক কিংবা প্রযোজকের কাছেও নয়।

রানি বলেন, সেই সময় তিনি চেয়েছিলেন নিজের যন্ত্রণাকে নিজের মধ্যেই ধরে রাখতে। তাঁর ভয় ছিল, ব্যক্তিগত শোকের কথা প্রকাশ পেলে মানুষ হয়তো ভাববে ছবির প্রচারের জন্যই তিনি এই গল্প বলছেন। বিশেষ করে যখন ছবিটি মুক্তি পায়, তখনও তিনি ইচ্ছে করেই নীরব ছিলেন। একজন অভিনেত্রী হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে সেই ক্ষত এতটাই ব্যক্তিগত ছিল যে তিনি সেটিকে জনসমক্ষে আনতে প্রস্তুত ছিলেন না।

‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচক—দু’পক্ষের কাছেই প্রশংসিত হয়। পর্দায় তাঁকে দেখা যায় এক অদম্য মায়ের চরিত্রে, যিনি নিজের সন্তানের জন্য পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেন। বাস্তব জীবনে সদ্য সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় থাকা একজন নারীর পক্ষে সেই চরিত্রে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু সেই গভীর শোকই যেন অভিনয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। অনেকেই পরে মন্তব্য করেছিলেন, রানির চোখের ভাষা, সংলাপের ভেতরের চাপা কান্না চরিত্রটিকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।

সম্প্রতি ‘মার্দানি ৩’-এর প্রচার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেই সময়ের কথা স্মরণ করেন রানি মুখার্জি। আবেগ ধরে রেখে তিনি বলেন, এই ছবিটা তাঁর জীবনে এমন এক সময়ে এসেছিল, যখন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। দ্বিতীয় সন্তানকে হারানোর শোক তখনও তাঁকে তাড়া করছিল। তবু গল্পটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হারানোর বেদনা আর ছবির গল্প যেন কোথাও গিয়ে এক হয়ে গিয়েছিল।

রানি মুখার্জির জীবনের এই স্বীকারোক্তি শুধু একজন তারকার ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি অসংখ্য নারীর নীরব যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। সমাজে গর্ভপাত বা গর্ভেই সন্তান হারানোর বিষয়টি এখনো অনেক ক্ষেত্রে চাপা পড়ে যায়। অনেক নারীই এই শোক একা বহন করেন, প্রকাশ্যে বলার সুযোগ বা সাহস পান না। রানি মুখার্জির মতো একজন পরিচিত মুখ যখন এই অভিজ্ঞতার কথা বলেন, তখন তা অন্য নারীদের জন্যও এক ধরনের সাহসের জায়গা তৈরি করে।

অভিনেত্রীর কাছের মানুষজন জানিয়েছেন, এই সময়টাতে তাঁর পরিবার বিশেষ করে স্বামী আদিত্য চোপড়া ও কন্যা আদিরা তাঁর পাশে ছিলেন শক্ত হয়ে। মাতৃত্বের যে আনন্দ তিনি একবার পেয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার শক্তি খুঁজে পান। কাজই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়লে কিছু সময়ের জন্য হলেও নিজের কষ্ট ভুলে থাকতে পেরেছেন তিনি।

‘মার্দানি ৩’ মুক্তির মধ্য দিয়ে আবারও শক্তিশালী নারী চরিত্রে ফিরেছেন রানি মুখার্জি। এই ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রতিটি ছবিতেই তিনি সমাজের অন্ধকার দিক, নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ এবং ন্যায়বিচারের লড়াইকে সামনে এনেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক সত্ত্বেও তাঁর এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী নন, একজন দৃঢ় মানসিকতার মানুষও।

রানির এই স্বীকারোক্তির পর বলিউড ও ভক্তমহলে সহানুভূতি ও ভালোবাসার জোয়ার বইছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সাহসের প্রশংসা করছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, তাঁর এই কথা হয়তো অনেক মায়ের অদেখা চোখের জলকে ভাষা দেবে। আবার কেউ বলছেন, ব্যক্তিগত শোককে পুঁজি না করে সঠিক সময়ে, নিজের শর্তে সত্যটা সামনে আনার মধ্যেই রানির ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে।

অভিনেত্রী নিজেও মনে করেন, এখন এই কথা বলার সময় এসেছে। কারণ তিনি চান মানুষ জানুক, জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতের মধ্যেও কীভাবে একজন নারী আবার উঠে দাঁড়াতে পারেন। তাঁর ভাষায়, কষ্ট কখনো হারিয়ে যায় না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে বয়ে নিয়ে চলার শক্তি তৈরি হয়।

নতুন ছবি ‘মার্দানি ৩’ যেমন দর্শকদের হলে টানছে, তেমনি রানির জীবনের এই না বলা গল্পও মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটছে। পর্দার বাইরে এই মানবিক সত্যিই যেন অভিনেত্রী রানি মুখার্জিকে আরও কাছের করে তুলেছে দর্শকদের কাছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত