বিদেশি বিনিয়োগ কমে আশিক চৌধুরীর চমক নেই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
বিদেশি বিনিয়োগ কমে আশিক চৌধুরীর চমক নেই

প্রকাশ: ৩১  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট-মাঝারি ও বড় কারখানার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ মানুষ কাজ হারাচ্ছেন। সেই সঙ্গে দেশের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবু আশিক চৌধুরীর নিয়োগ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এক চমক দেখিয়েছিল। সিঙ্গাপুর থেকে তরুণ ব্যাংকার হিসেবে তিনি বিডার শীর্ষপদে আসেন। তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গত ১৬ মাসে সেই চমকটি দেখা যায়নি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আর্থিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন রোধ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশকে সন্তোষজনক বলা যায় না। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, ছোট-মাঝারি এবং বড় কারখানা বন্ধ হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২৩.৫১ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ২২.৪৮ শতাংশে নেমেছে। সেই বছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল ২৮১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহও ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শেষ মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের বেশি।

ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, রাজস্বনীতি বিনিয়োগবান্ধব নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বেশি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। দেশের প্রতিযোগী দেশগুলো বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে।

বেসরকারি গবেষক মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা দেখা দিলেই নতুন বিনিয়োগ থেমে যায়। উদ্যোক্তারা মানসম্মত বিদ্যুৎ ও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। ব্যাংকের ঋণের উচ্চ সুদ, ব্যবসার খরচ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন হয়নি। ফলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত হচ্ছে না। তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের সমাধানে বড় পরিকল্পনা করা দরকার ছিল এবং বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানো দ্রুত করতে উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।

বিদেশি বিনিয়োগের ধারা নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে নিট এফডিআই বাড়লেও নতুন বিনিয়োগ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন এফডিআই এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছর তা ছিল ৬৭ কোটি ডলার। করোনাকালেও নতুন বিনিয়োগ বেশি ছিল। আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে ২০২৪ সালে দেশের পরিস্থিতি দেখে ২০২৫ সালে কেউ কেন বিনিয়োগ করবেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ।

নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর দায়িত্ব নেওয়ার পর, তিনি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ব্যবসায়িক সমস্যাগুলো শনাক্ত করেছিলেন। তিনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে বাস্তবে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ব্যবসার পরিবেশ সূচক (বিবিএক্স) অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা, অবকাঠামো, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ ও পরিবেশগত মান—এই ছয় সূচকে অবস্থার অবনতি হয়েছে।

আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে বিভিন্ন বিনিয়োগ সম্মেলন ও বিদেশি সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। মার্চে যুক্তরাজ্য সফর, জানুয়ারি ও মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সফর—তবে প্রত্যাশিত এফডিআই আসেনি। দেশে বিনিয়োগের প্রস্তাবও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৬ শতাংশ, দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোন চমক দেখা যায়নি।

আশিক চৌধুরীর ব্যক্তিগত সাহসিকতার গল্পও আছে। তিনি স্কাই ডাইভিংয়ে বিশ্ব রেকর্ড করেছেন। তবে প্যারাট্রুপার অভিযানের মাধ্যমে গিনেস রেকর্ডে নাম ওঠলেও দেশের অর্থনীতিতে তেমন চমক আনতে পারেননি। তিনি মনে করেন, দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলেও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

বেসরকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ—সব কারণে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে যথেষ্ট সাহসী সংস্কারের প্রয়োজন। এ বিষয়ে মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার ছোট খাতে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তবে তা নগণ্য। বড় সংস্কার হয়নি।

পরিশেষে বলা যায়, আশিক চৌধুরীর দায়িত্বগ্রহণে অনেকটা চমক থাকলেও, বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চমক দেখানো সম্ভব হয়নি। দেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় পদক্ষেপ নেওয়া, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী অবকাঠামো ও সেবা নিশ্চিত করা এখনো জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত