র‌্যাবের নাম বদলে ‘এসআইএফ’, নতুন অধ্যায়ের ঘোষণা সরকারের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
র‌্যাবের নাম পরিবর্তন এসআইএফ

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—সংক্ষেপে র‌্যাব—এর নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখা হচ্ছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ বা সংক্ষেপে এসআইএফ। মঙ্গলবার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে কোর কমিটির বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়, সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে এবং প্রধান উপদেষ্টা নতুন নাম অনুমোদন দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, প্রয়োজনীয় আদেশ জারি হওয়ার পরই নতুন নামে বাহিনীটির কার্যক্রম শুরু হবে। নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি বাহিনীর পোশাকেও পরিবর্তন আনা হবে। তাঁর ভাষায়, এই পরিবর্তন শুধু একটি নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাহিনীর কার্যক্রম, কাঠামো ও ভাবমূর্তিতেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হবে। যদিও তিনি বিস্তারিত কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি দেননি, তবে সরকারি সূত্রগুলো বলছে, র‌্যাবকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রেক্ষাপটেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

র‌্যাব গঠনের ইতিহাস বেশ পুরোনো নয়, কিন্তু এর প্রভাব ও বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত। ২০০৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে র‌্যাব গঠিত হয়। এরও আগে বাহিনীটি পরীক্ষামূলকভাবে ‘র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম’ বা র‌্যাট নামে পরিচিত ছিল। সন্ত্রাস, চরমপন্থা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে র‌্যাব দ্রুতই পরিচিতি পায় এবং নানা অভিযানে আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীটির বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও জমতে থাকে।

বিশেষ করে ‘ক্রসফায়ার’ নামে পরিচিত অভিযানের ঘটনায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ র‌্যাবের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় র‌্যাব একটি বিতর্কিত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাব এবং বাহিনীটির সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের সরকার ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং র‌্যাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

এরপর ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর একটি তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়, যা দেশের ভেতরে ও বাইরে নতুন করে আলোচনার ঝড় তোলে। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘদিন ধরেই র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছিল এবং জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনের পর তাদের দাবি আরও জোরালো হয়।

এই পটভূমিতে র‌্যাবের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা হলেও প্রশমিত করার চেষ্টা করছে। তবে তারা এটাও বলছেন, কেবল নাম পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; বাহিনীর কার্যপ্রণালী, জবাবদিহি ও আইনি কাঠামোয় দৃশ্যমান সংস্কার না এলে এই পরিবর্তন টেকসই হবে না।

অন্যদিকে, সরকারি মহলের যুক্তি হলো, নতুন নাম ও কাঠামোর মাধ্যমে বাহিনীটির ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ নামটি একটি পেশাদার, লক্ষ্যভিত্তিক ও আইনসম্মত হস্তক্ষেপকারী বাহিনীর ধারণা তুলে ধরে, যা আগের বিতর্কিত ইমেজ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসআইএফকে এমনভাবে গড়ে তোলা হবে যেন এটি আধুনিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ হলেও মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের ভয় ও অনাস্থার পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে এই সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক সূচনা হতে পারে। আবার অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, নাম ও পোশাক বদলালেও যদি আচরণ ও মানসিকতায় পরিবর্তন না আসে, তাহলে এই উদ্যোগ জনমনে আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, যেখানে কেউ সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন, আবার কেউ এটিকে ‘কসমেটিক পরিবর্তন’ বলে সমালোচনা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, র‌্যাব থেকে এসআইএফে রূপান্তর যদি সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হয়, তাহলে স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা এবং আইনের আওতায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ, অপারেশনাল নীতিমালা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে র‌্যাবের নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ করা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার চর্চার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে কতটা বাস্তব সংস্কারে রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত