হারানো ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণে বাঁশ ও বেত শিল্পের সম্ভাবনা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৪০ বার

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ। ডেস্কএকটি বাংলাদেশ অনলাইন

কখনো কোনো গ্রামীণ হাটে কিংবা মেলার আঙিনায় গেলে আজও চোখে পড়ে বাঁশ আর বেতের তৈরি শুঁড়ি, ঝুঁড়ি, চাঙারি কিংবা দোলনা—যার প্রতিটি ছোঁয়ায় লুকিয়ে থাকে গ্রামের মানুষের সৃজনশীলতা আর শ্রমঘাম। অথচ সময়ের পালাবদলে সেই নিপুণ হস্তশিল্প আজ হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তবুও আশার কথা হলো—বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বাঁশ ও বেত শিল্প আবারও জেগে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দেশের নানা অঞ্চলে একসময় বাঁশ ও বেত ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গৃহস্থালির ব্যবহার থেকে শুরু করে শৈল্পিক নকশার পণ্য—সব কিছুতেই ছিল এই দুই কাঁচামালের অবাধ ব্যবহার। কিন্তু সহজলভ্য প্লাস্টিক আর মেশিনে তৈরি ফ্যাক্টরি পণ্য এসে দখল করে নিয়েছে বাঁশ-বেতের জায়গা। বাঁচতে গিয়ে এই শিল্পের কারিগররা নানাভাবে সংগ্রাম করলেও টিকে থাকতে পারেননি।

প্রধান সমস্যার শুরু কাঁচামাল সংকটে। গ্রামের পথঘাটে একসময় চোখে পড়ত যত্রতত্র বাঁশঝাড় আর বেতের ঝোপঝাড়—এখন সেসব কমে গেছে। অপরিকল্পিতভাবে বাঁশ কাটা, বনাঞ্চল সঙ্কোচন আর সঠিকভাবে পুনঃরোপণ না হওয়ায় বাঁশ-বেতের জোগান হুমকির মুখে পড়েছে। অপরদিকে, বাজারে সস্তা দরের প্লাস্টিকের পণ্যের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ-বেতের গুণগতমানের জিনিসগুলো।

অবহেলিত আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য কারিগর আজ ভিন্ন পেশায় চলে গেছেন। আর্থিক অনিশ্চয়তা, সঠিক প্রশিক্ষণ আর সমকালীন নকশার অভাবে তাদের সন্তানেরাও আর এ পেশায় আসতে চাইছে না। ফলে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই হস্তশিল্প প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে।

তবে আশার আলোও দেখা যাচ্ছে কিছু জায়গায়। দেশের বিভিন্ন শিল্পবিষয়ক সংস্থা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর কিছু স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ নতুন করে বাঁশ ও বেত শিল্পকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। নানা হস্তশিল্প মেলায় এখনো বাঁশ ও বেতের কাজ ভালোই বিক্রি হচ্ছে—বিশেষ করে বিদেশি পর্যটক বা হাতে তৈরি জিনিসের ভক্তদের কাছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা আর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ থাকলে এই শিল্প আবারও সোনালী দিন দেখতে পারে। তার জন্য দরকার সবার আগে পর্যাপ্ত কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা। সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা অঞ্চলে বাঁশ ও বেতের বাগান পরিকল্পিতভাবে রোপণ করে টেকসইভাবে সংগ্রহ করতে হবে।

কারিগরদের আধুনিক প্রশিক্ষণও জরুরি। বিশ্ববাজারে হাতের তৈরি পণ্যের চাহিদা সবসময়ই আছে—শুধু নকশা আর প্যাকেজিংয়ে নতুনত্ব আনতে হবে। এ জন্য সরকার ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ডিজাইন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা যেতে পারে।

আরও বড় বিষয় হলো, নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রকল্পভিত্তিক হাতে-কলমে শেখানো, হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা—সবকিছু মিলিয়ে সচেতনতার বীজ বুনতে হবে পরিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত।

যদি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সহজ ঋণ সুবিধা, উপকরণ ভর্তুকি ও বাজারজাতকরণের সহায়তা পাওয়া যায়, তাহলে গ্রামীণ বাঁশ ও বেত শিল্প শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক হস্তশিল্পের বাজারেও আবার পরিচিতি ফিরে পেতে পারে।

বাঁশ-বেত শুধু পণ্য নয়—এটি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য, টিকে থাকার লড়াইয়ের সাক্ষী, আর নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনাময় পথ।আজকাল অনেকেই নিজের ঘরের আঙ্গিনা রেস্তরা সাজাতে রুচির পরিচয় ধারণ করেন এই শিল্পের সৌন্দর্যে যুগের হাত ধরে হারাতে নয়—সম্ভাবনা আর সৃজনশীলতায় ভর করে নতুন রূপে ফিরে আসাই হোক এই প্রাচীন শিল্পের ভবিষ্যৎ।

 

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত