প্রকাশ: ১৫ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইরান আবারও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির আওতায় ‘স্ন্যাপব্যাক’ পদ্ধতি ব্যবহার করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার যে কোনো প্রয়াসের জবাবে দেশটি “সমান ও যথাযথ প্রতিক্রিয়া” জানাবে। সোমবার (১৪ জুলাই) তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন হুঁশিয়ারি দেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই।
ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানি সম্প্রতি এক যৌথ বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান চুক্তির শর্তাবলি লঙ্ঘন অব্যাহত রাখলে তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পদক্ষেপ নিতে পারে। এ পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে পরমাণু চুক্তির একটি ধারা—‘স্ন্যাপব্যাক’ পদ্ধতি—যার মাধ্যমে কোনো পক্ষ চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ আনলে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত আসতে পারে।
এ ব্যাপারে বাকাই বলেন, “এই ধরনের অবস্থান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের দীর্ঘমেয়াদি বৈরিতার বহিঃপ্রকাশ।” তিনি আরও বলেন, “ইরান এর জবাবে কেবল প্রতিক্রিয়াই নয়, বরং সমান মাত্রায় ও যথাযথ কৌশলে পদক্ষেপ নেবে।”
ইরান দাবি করে, তাদের পরমাণু কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং চুক্তির আওতায় অনুমোদিত সীমার মধ্যেই ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে ইরানের পরমাণু ও সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ এবং পশ্চিমাদের চাপে এই অঞ্চল আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে।
বাকাই আরও উল্লেখ করেন, “যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত মাসে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় টানা ১২ দিন বিমান ও ড্রোন হামলা চালায়, তখন চুক্তির আইনি ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ধাপে ধাপে কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে, যা চুক্তির ধারা অনুযায়ী বৈধ।”
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিটি ছিল ইরান এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—এবং জার্মানির মধ্যে সম্পাদিত। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ও মজুত সীমিত রাখবে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পরিদর্শনের সুযোগ দেবে। বিনিময়ে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে।
তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে গিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এ সিদ্ধান্তের পর থেকেই চুক্তিটি কার্যত ঝুলে পড়ে। যদিও ইউরোপীয় দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো চুক্তির অংশ রয়েছে, তারা নানা সময়ে ইরানকে দোষারোপ করে যাচ্ছে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে।
চলতি বছরের ১৩ জুন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়, যার পর ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটি ও গোয়েন্দা কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। এ সংঘাত ২৪ জুন একটি যুদ্ধবিরতিতে গড়ালেও উভয় পক্ষ এখনো স্নায়ুযুদ্ধের অবস্থায় রয়েছে।
এমন পটভূমিতে ইউরোপের পক্ষ থেকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগকে ইরান রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবে দেখছে এবং তার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি যদি এমনভাবেই এগোয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়বে এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
ইরানের এই হুঁশিয়ারি কেবল ইউরোপ নয়, গোটা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। চুক্তির ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের পথ খুঁজে না পেলে, পরিস্থিতি অচিরেই ভয়াবহ মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।