ভালো মব, খারাপ মব ,কে কার মব, কোনটা কার স্বার্থে?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫
  • ৮৬ বার

 

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশে এখন মব–সন্ত্রাস যেন এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির রূপ নিয়েছে। কোথাও প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে, কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই জনগণ মিলে কারও প্রতি অন্যায় বা অভিযোগের বিচার নিজেরাই করতে নামছে। ঢাকার বুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র, এমনকি সাধারণ নাগরিক সবাই কোনো না কোনোভাবে এই ‘মব’ নামের অদৃশ্য শক্তির শিকার বা অংশীদার হয়ে উঠছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭১ জন শিক্ষক যখন মব–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিলেন, তখনই আরেকটি শিক্ষক গোষ্ঠী—বিএনপিপন্থী সাদা দল—তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলল। তাদের দাবি, এই শিক্ষকরা নাকি ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’। ফলে দেশে মবের চরিত্র বা চেহারার চেয়ে বড় হয়ে উঠল—কোন মব ভালো আর কোন মব খারাপ, আর সেই বিতর্কের রাজনীতি।

ঢাকার রাজপথ থেকে গ্রামগঞ্জের গলি—সবখানেই এই নতুন ‘মব–সাহসিকতা’ ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ী সোহাগের খুনের ঘটনায়ও উঠে এসেছে মবের ছায়া—স্লোগান, ভিড়, দখল আর হুমকির অদৃশ্য চাপ। একবার মব তৈরি হলে কারো পক্ষে সহজে সে ভাঙা সম্ভব হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মবের মধ্যে পড়ে দ্বিধায় পড়ে, রাজনৈতিক দলগুলো মবকে কাজে লাগায় আর জনগণ বিভক্ত থাকে—‘আমার মব’, ‘তোমার মব’!

মব–সন্ত্রাসের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে যে যুক্তির পাহাড় তোলা হয়, সেটিও কম বিস্ময়কর নয়। কখনো ধর্ম রক্ষার কথা, কখনো ‘জাতীয় দায়িত্ব’, কখনো ‘ফ্যাসিবাদ উৎখাত’। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, বাউল গানের আসর থেকে নরসুন্দরের দোকান, মাজার থেকে মিউনিসিপ্যালিটি অফিস—সব জায়গায়ই মব নিজের হাতে ‘বিচার’ করে নেয়। কেউ হয়তো ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পেটায়, কেউ চাঁদাবাজি আটকানোর নামে চাঁদা তোলে, কেউ নির্বাচনী হেরফের ঠেকাতে তালা ঝুলিয়ে দেয়।

ঢাকায় একসময় ‘ঢাকাবাসী’ ব্যানারে মিউনিসিপ্যালিটিতে তালা মেরেছিল একদল লোক, দাবি ছিল এক নেতার হাতে ছাড়া অন্য কেউ সেবা দিতে পারবে না। আবার এনবিআর-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলে দীর্ঘদিন তালা লাগিয়ে রেখেছিল তাদের অফিসে। ভিন্ন দাবিতে আবার নতুন নতুন মব গড়ে ওঠে। প্রতিটি মবই যুক্তির পাহাড় তুলে বলে—এটা তাদের অধিকার, এটাই ন্যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আইন কোথায়? সরকার কোথায়? পুলিশের যে কর্মকর্তা নিয়মমাফিক কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় মবের চাপে চাকরি হারাচ্ছেন, সেই পুলিশ কি আর আগামিতে মব থামাতে সাহস পাবে? মব যখন রাজনীতি বা ধর্মের ছায়া পায়, তখন আর তাকে রুখতে রাষ্ট্র বা সমাজের সাধ্য থাকে না—এটাই এই সময়ের বড় বাস্তবতা।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও এই মব–সংস্কৃতি থেকে নিজেদের পুরোপুরি সরিয়ে রাখতে পারছে না। বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিবৃতি দেন মব–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, কিন্তু পরক্ষণেই দেখা যায় দলটিরই কর্মীরা কোথাও না কোথাও মবের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অফিস বা বৈঠক ভাঙছেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও নির্বাচনকে ঘিরে মবের হুমকি শোনা যাচ্ছে। ধর্মীয় কট্টরপন্থী দলগুলো বাউলগান বা মাজার ভাঙার মবকে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই বলে আখ্যা দিচ্ছে।

অন্যদিকে ‘মুক্তচিন্তা পরিষদ বাংলাদেশ’ কিংবা ‘সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন’ নামের ছোট ছোট সংগঠনগুলো রাস্তায় নামছে, মব–সন্ত্রাস বন্ধে বিবৃতি দিচ্ছে, অথচ মূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ নিয়ে কার্যত নীরব। কোনো বড় রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে শোনা যায় না শক্ত কোনো ভাষণ—‘মবের কোনো যুক্তি নেই, মব–সন্ত্রাস মানেই অপরাধ।’

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, এখনো এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট কোনো বার্তা দেননি—যদিও তাঁর একটি সরাসরি বক্তব্যই সমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে পারত। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সরকার যদি মবের সঙ্গে আপস করে চলে, পুলিশ যদি ভয়ে পাশে না দাঁড়ায়, আর রাজনীতিকরা যদি নিজেদের প্রয়োজনে মবকে হাতিয়ার করে, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা রক্ষার ন্যূনতম জোরও থাকবে না।

এই দেশে মবের কোনো রং নেই—সব মবই শেষ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। মবকে মদদ দেওয়া মানেই অপরাধী গোষ্ঠীকে শক্তি জোগানো। আর সেই শক্তি একসময় রাষ্ট্রকেই ভোগ করবে।

সুতরাং সময় এসেছে—রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে প্রতিটি দলের নেতা, শিক্ষক সমাজ, নাগরিক সমাজ—সবাইকে স্পষ্ট ও এক কথায় বলতে হবে—‘ভালো মব’ বলে কিছু নেই। মব–সন্ত্রাসকারীদের শাস্তি দিতে হবে। যারা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হুমকি দেয়, তালা ঝুলিয়ে দেয়, পিটিয়ে হাতের কাছে মানুষ তুলে দেয়, তাদের আর ‘আপনজন’ ভেবে আড়াল করলে চলবে না।

কারণ আজকের মব, কালকের আরও বড় মব—শেষ পর্যন্ত এই মবই একদিন রাষ্ট্রকেও গিলে খাবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত