প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে ঘরের দেয়াল চাপা পড়ে রেজোয়ান হোসেন নামের এক স্কুলছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মাত্র তেরো বছর বয়সী এই কিশোরের অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবার, সহপাঠী এবং প্রতিবেশীরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে হাসিখুশি সেই ছেলেটি আর কখনও স্কুলের মাঠে ফিরবে না।
ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাতে উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়নের কুমারগঞ্জ গ্রামে। নিহত রেজোয়ান ওই গ্রামের তাহেরুল ইসলামের একমাত্র সন্তান এবং নেকমরদ আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। পরিবারের স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে একদিন শিক্ষিত মানুষ হবে, সমাজে ভালো কিছু করবে। কিন্তু একটি ঝড় সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই থামিয়ে দিল।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতের দিকে হঠাৎ করে আকাশে কালো মেঘ জমে ওঠে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় প্রবল কালবৈশাখী ঝড়। মুহূর্তের মধ্যে বাতাসের গতি বাড়তে থাকে এবং চারদিকে তাণ্ডব শুরু হয়। গ্রামের বহু টিনের ঘর ও গাছপালা তীব্র ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময় রেজোয়ান তার পরিবারের সঙ্গে ঘরে ঘুমিয়ে ছিল। প্রবল বাতাসে তাদের ঘরের টিনের চালা উড়ে যায় এবং দেয়ালের একটি অংশ ভেঙে পড়ে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইটের তৈরি সেই প্রাচীরের উপরের অংশ ভেঙে সরাসরি রেজোয়ানের শরীরের ওপর পড়ে। পরিবারের সদস্যরা এবং প্রতিবেশীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মুহূর্তেই নিভে যায় একটি সম্ভাবনাময় জীবনের আলো।
ঘটনার পরপরই এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। প্রতিবেশীরা জানান, রেজোয়ান ছিল অত্যন্ত ভদ্র এবং হাসিখুশি স্বভাবের ছেলে। সে নিয়মিত স্কুলে যেত এবং পড়াশোনায় ভালো ছিল। তার অকাল মৃত্যুতে গ্রামের মানুষ গভীরভাবে মর্মাহত। অনেকে বলছেন, এমন প্রাণবন্ত একটি শিশুর মৃত্যু তারা সহজে মেনে নিতে পারছেন না।
রাণীশংকৈল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমানুল্লাহ আল বারী ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে দেয়াল চাপা পড়ে এক কিশোরের মৃত্যুর খবর তারা পেয়েছেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং পরিবারটির জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে একই ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ভুট্টা ও আলুসহ চলতি মৌসুমের বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় ক্ষেতের ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। প্রবল বাতাসে বহু গাছপালা উপড়ে পড়েছে এবং কিছু ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরে পরিশ্রম করে তারা যে ফসল ফলিয়েছিলেন, ঝড়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার বড় অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছরই কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে কৃষিক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণের জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। তারা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছেন।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পর প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কমিয়ে আনতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিহত রেজোয়ানের পরিবারের জন্য সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারণ পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তারা এখন অসহায় অবস্থায় আছেন।
গ্রামবাসীরা জানান, ঝড় থেমে গেলেও কুমারগঞ্জ গ্রামের মানুষ এখনও সেই রাতের ভয়াবহ মুহূর্ত ভুলতে পারছেন না। অনেকের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কেউ হারিয়েছেন ফসল, আর একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের একমাত্র সন্তানকে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের জীবনের একটি বাস্তবতা। প্রতি বছরই কালবৈশাখী ঝড় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। তবে প্রতিবারই এই ধরনের দুর্ঘটনা মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনা রেখে যায়। রেজোয়ান হোসেনের মৃত্যু সেই বেদনাকে আরও গভীর করে তুলেছে।
একটি ছোট্ট গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কিশোরের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ভালো কিছু করা। তার সহপাঠীরা বলছে, স্কুলে সে সবসময় হাসিখুশি থাকত এবং বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। এখন সেই বেঞ্চে বসে থাকা বন্ধুরা তাকে আর কখনও দেখতে পাবে না।
গ্রামের প্রবীণরা বলছেন, রেজোয়ানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো গ্রামের ক্ষতি। একটি প্রাণবন্ত শিশুর জীবন ঝড়ে থেমে যাওয়ার এই ঘটনা সবাইকে শোকাহত করে তুলেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রামীণ এলাকায় দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো তৈরি করা গেলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
রেজোয়ান হোসেনের অকাল মৃত্যু সবাইকে মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির এক মুহূর্তের রোষ কখনও কখনও মানুষের জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তার স্মৃতি এখন পরিবারের পাশাপাশি পুরো গ্রামের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।