প্রকাশ: ১৮ জুলাই | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হয়েছে—যার তিনটি প্রধান কারণ হলো ঋণখেলাপি, ঘুষ-দুর্নীতি ও অর্থ পাচার। এই ত্রিমুখী দুর্বৃত্তায়নের থাবায় জর্জরিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, ধসে পড়ছে আর্থিক শৃঙ্খলা, আর দুর্বল হয়ে পড়ছে আইনের শাসন। অপ্রতুল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এই তিনটি দুর্যোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে সম্ভাবনাময় একটি জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তিনটি ব্যাধি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ পাচারের জন্য প্রয়োজন হয় ব্যাংকিং সুবিধা ও রাজনৈতিক আশ্রয়। আবার যারা এসব সুবিধা দেয়, তারাও দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে নিজেদের লাভবান করে তোলে। ফলে পুরো ব্যবস্থাপনা এমন এক অদৃশ্য চক্রের আবর্তে বন্দি হয়ে পড়ে, যেখানে আইনের প্রয়োগ, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
২০২৪ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা তিন মাস আগেও ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৯০ দিনের ব্যবধানে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এই বিশাল ঘাটতি একদিকে যেমন সাধারণ আমানতকারীদের আস্থার অপমৃত্যু ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চোখেও বাংলাদেশকে একটি অনির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক গন্তব্যে পরিণত করছে।
দুর্নীতির আরও ভয়াবহ রূপ ধরা পড়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে’-তে। এতে দেখা গেছে, সরকারি সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে ৩২ শতাংশ নাগরিককে ঘুষ দিতে হয়েছে। সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এসেছে বিআরটিএ, যেখানে ঘুষ দিতে হয়েছে ৬৩ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে। পাসপোর্ট অফিস, ভূমি রেজিস্ট্রি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অবস্থাও একই রকম হতাশাজনক।
এই দুর্নীতির অর্থ কোথায় যায়? তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ৮ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার সমান, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি। এই চিত্র শুধু সুইজারল্যান্ডে সীমাবদ্ধ নয়—পানামা, মালয়েশিয়া, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া—সব জায়গাতেই বাংলাদেশি কালো টাকার বিনিয়োগের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থ পাচারের পেছনে যেমন রয়েছেন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা, তেমনি রয়েছেন আমলারা, রাজনীতিকরা, বিচারক, এমনকি আইনপ্রণেতারাও। অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র থেকে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে দেশের বাইরে। গড়ে প্রতি বছর পাচার হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে দেশের সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে যেত।
সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশই চাঁদাবাজি ও ঘুষে চলে যায় ক্ষমতাসীনদের পকেটে। শেয়ারবাজার থেকে আত্মসাৎ করা অর্থ, ব্যাংক থেকে অনাদায়ী ঋণ ও সরকারি কেনাকাটায় লুটপাটের মাধ্যমে প্রভাবশালীরা শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন, যা অবশেষে রেমিট্যান্স বা হুন্ডির মারফত পাচার হচ্ছে বিদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বৈধ পথে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণের হার কিছুটা বেড়েছে, তবে এর পেছনেও এক অংশ আছে অবৈধ টাকার পুনর্ব্যবহার।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই), পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসের মতো সূত্র থেকে অর্থ পাচারের বহু তথ্য প্রকাশ পেলেও তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বরং এড়িয়ে গেছে।
পরিবর্তনের কিছু ক্ষীণ আশাবাদ দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্তত এক ডজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাচার করা অর্থ শনাক্ত হয়েছে এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই উদ্যোগ কতদূর কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ওপর।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পেছনে কেবল বাইরের কোনো ষড়যন্ত্র নেই; রয়েছে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিস্তৃত ও গভীর জাল। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে একদিকে যেমন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তেমনি প্রয়োজন সামাজিকভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অশ্রয়হীন প্রতিরোধ। জনমত, মিডিয়া, সুশীল সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত প্রতিবাদই হতে পারে এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে বাংলাদেশের যাত্রার প্রথম ধাপ।
সত্যিকার অর্থে, বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে খেলাপি ঋণ, ঘুষ-দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতেই হবে—তা না হলে এই অর্থনৈতিক ক্যানসার গোটা রাষ্ট্রকে অকেজো করে তুলবে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন