ষড়যন্ত্র আর অনিশ্চয়তায় ধ্বংসের মুখে চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ১৮ জুলাই | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট উপকূলবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প—জাহাজ ভাঙা শিল্প—এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক চাপে আর প্রতিবেশী দেশের প্রভাবশালী কূটচালে এ শিল্প আজ অচল প্রায়। একসময় এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, বর্তমানে তা তীব্র সংকট আর নীতিগত জটিলতায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়কালে যাত্রা শুরু করা এই শিল্পটি ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম বৃহৎ কাঁচামাল সরবরাহকারী খাতে পরিণত হয়। উপকূলীয় ছলিমপুর, ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ও কুমিরা ইউনিয়নে প্রায় ২০০টি শিপইয়ার্ড গড়ে উঠে। এখান থেকে দেশের রড, স্টিল, তামা, পিতলসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামাল সরবরাহ হতো। শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা নয়, বিদেশেও রপ্তানি হতো এসব মূল্যবান ধাতব উপাদান। ফলে এই শিল্প থেকে সরকার বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পেত এবং লাখ লাখ মানুষ এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেত।

তবে সবকিছু পাল্টে যেতে শুরু করে যখন আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমও ও হংকং কনভেনশন পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য রক্ষার নামে জাহাজ ভাঙা শিল্পে নতুন নতুন কঠিন শর্ত আরোপ করে। ২০২৩ সালে হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর মাত্র ১৩টি শিপইয়ার্ড “গ্রীন শিপইয়ার্ড” হিসেবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বীকৃতি পায়। এই কনভেনশনের মেয়াদ ২০২৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত থাকলেও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ পূর্বসতর্কতা বা সময়োপযোগী উদ্যোগ না নেওয়ায় অধিকাংশ শিপইয়ার্ড এই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়।

ফলে এই ১৩টি ছাড়া বাকি সব শিপইয়ার্ডে কার্যত জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। শিপ আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, যার ফলে অধিকাংশ শিপইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক মালিক ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়াত্বের দিকে চলে গেছেন। শ্রমিকেরা হারিয়েছেন কাজ, তাদের পরিবারে নেমেছে অভাব ও অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। দীর্ঘদিনের শ্রমনির্ভর এই শিল্পে বেকার হয়ে পড়েছে লাখ লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী। সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় রকমের ধস নেমেছে।

মোহরম ইস্পাত কারখানার মালিক কামাল পাশা জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। শিপইয়ার্ড বন্ধ হওয়ায় দেশে রড ও নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ জনগণের ওপর নির্মাণ খরচের বাড়তি চাপ পড়ছে। তিনি বলেন, “আমাদের দেশেই যখন এই কাঁচামাল উৎপাদনের সুযোগ ছিল, তখন কেন আমরা আমদানির ওপর নির্ভর হবো? এটা সরাসরি দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার চক্রান্ত।”

কামাল পাশা আরও জানান, বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক লায়ন আসলাম চৌধুরী হংকং কনভেনশনের সময়সীমা অন্তত দুই বছর বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সময় বাড়ানো গেলে অনেকগুলো শিপইয়ার্ড গ্রীন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের সুযোগ পাবে এবং ধ্বংসের হাত থেকে শিল্পটি রক্ষা পাবে।

শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, ২৫ জুনের পর থেকে গ্রীন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো শিপইয়ার্ডে জাহাজ কর্তন করা যাবে না। তবে এর আগে বিচিং হওয়া জাহাজগুলো কাটা যাবে। তিনি জানান, সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ এই শিল্পের এমন দুরবস্থা।

তবে স্রেফ আন্তর্জাতিক চাপে এই শিল্পের পতন নয়—দেশীয় রাজনৈতিক অসতর্কতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও বিশেষ মহলের নিরব ভূমিকার কারণেও এই সংকট আজ এই জায়গায় পৌঁছেছে। অনেকে অভিযোগ করছেন, ভারতের কূটনৈতিক চাপ ও তাদের ইস্পাত শিল্পের স্বার্থে এই চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প ধ্বংস হয় এবং তারা উপকৃত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করে গ্রীন শিপইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি প্রণোদনা ও সময় বৃদ্ধির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিকল্প পথ খুঁজে না পেলে একটি বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী পরিবারসহ গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত হবে।

চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্প শুধুমাত্র একটি শিল্পখাত নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক প্রবাহ, একটি শ্রমনির্ভর কর্মযজ্ঞ। দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে না পারলে ক্ষতি হবে শুধু এই শিল্পের নয়—ক্ষতি হবে জাতীয় অর্থনীতির, ক্ষতি হবে দেশের ভবিষ্যতের।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত