প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট লড়াইয়ে ঐতিহাসিক বিজয়ের সাক্ষী হলো মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। টানা ব্যর্থতার গ্লানি মুছে দিয়ে বাংলাদেশ দল একটি স্বপ্নময় জয় অর্জন করলেও পাকিস্তানের কাছে দিনটি ছিল হতাশার। বিশেষ করে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারের পর উইকেট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান দল। ম্যাচের পরপরই পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দলের অধিনায়ক সালমান আগার অসন্তোষ প্রকাশ এবং পরে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কোচ মাইক হেসনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া বিষয়টিকে আরও নাটকীয় করে তোলে।
রোববার অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে পাকিস্তানকে মাত্র ১১০ রানে গুটিয়ে দেয় স্বাগতিক বাংলাদেশ। বল হাতে প্রথম ধাক্কা দেন তাসকিন আহমেদ, এরপর মোস্তাফিজুর রহমান নিজের জাদুকরী বোলিংয়ে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তোলেন। মাত্র ৪ ওভার বল করে ২৪টি বলের মধ্যে ১৮টি ডট দেন মোস্তাফিজ, রান দেন মাত্র ৬, তুলে নেন দুটি উইকেট। আর ব্যাট হাতে ঝড় তোলেন পারভেজ হোসেন। ৩৯ বলে ৫৬ রানের অপরাজিত ইনিংসে তিনটি চার এবং পাঁচটি ছক্কা হাঁকিয়ে নিশ্চিত করেন বাংলাদেশের জয়। ম্যাচ শেষ হয় ২৭ বল হাতে রেখেই।
তবে এমন পরাজয়ের পর নিজেদের ব্যর্থতার দায় অনেকটাই উইকেটের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “এই পিচ কোনো দলের জন্যই আদর্শ নয়। এখানে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট খেলা সম্ভব নয়। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তার মতে, আসন্ন এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টের আগে এমন ধরনের উইকেট খেলোয়াড়দের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অন্তরায়।
কোচ হেসনের এমন বক্তব্য অবশ্য চ্যালেঞ্জ করে দেন ম্যাচসেরা পারফরমার পারভেজ হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে হেসনের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, “পাকিস্তান কোচ যা বলেছেন, আমি সেটা গ্রহণযোগ্য মনে করি না। আমরা তো এই উইকেটেই ১৬ ওভারে ১১০ রান করেছি। যদি ২০ ওভার খেলতাম, ১৬০ রান করাও সম্ভব ছিল। হতে পারে ওরা মানিয়ে নিতে পারেনি, কিন্তু আমরা চেষ্টা করেছি।” তিনি আরও বলেন, “মিরপুরের উইকেট বরাবরই বোলারদের সহায়ক। এখানে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলতে হয়, সেট হওয়া গেলে রান করাও সম্ভব।”
এই জয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি ঘটেছে—২০১৫ সালের পর প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে পাকিস্তানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ ৯ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারভেজ বলেন, “এই নিয়ে আলাদা কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভালো খেলেছিলাম, আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা করছি। সেই ছন্দেই খেলছি।”
এদিকে, ম্যাচ বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের হারের পেছনে শুধুই উইকেটকে দায়ী করা যুক্তিযুক্ত নয়। তাদের ব্যাটিং লাইনআপের ব্যর্থতা, পরিকল্পনার ঘাটতি ও ফিল্ডিংয়ের ত্রুটি ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে, বাংলাদেশ দল যেন প্রতিটি বিভাগেই খেলেছে ছন্দে। বোলিংয়ে মোস্তাফিজের কার্যকর ডেলিভারি, তাসকিনের আগ্রাসন এবং ব্যাটিংয়ে পারভেজের নির্ভরতা ম্যাচটিকে একপাক্ষিক করে তোলে।
তবে উইকেট বিতর্ক ক্রিকেট বিশ্বের জন্য নতুন নয়। উপমহাদেশে বিশেষ করে ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়াম বরাবরই পরিচিত স্পিন সহায়ক ও ধীর গতির উইকেট হিসেবে। এই ধরনের উইকেটে খেলার জন্য কৌশলগত মানিয়ে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই—এমনটাই মনে করেন অধিকাংশ ক্রিকেট বিশ্লেষক।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশের জন্য আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার একটি বড় উপলক্ষ, আর পাকিস্তানের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ। একটি দল যেখানে সমন্বিত প্রচেষ্টায় জয় তুলে নেয়, অন্যদল সেখানে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে খুঁজছে অজুহাত।
ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, বরং কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা ও সামঞ্জস্যের লড়াই—মিরপুরে তা ফের প্রমাণিত হলো।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন