প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব লিভারপুলে একটি যুগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে দলের রক্ষণভাগে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠা স্কটিশ ডিফেন্ডার অ্যান্ডি রবার্টসন চলতি মৌসুম শেষে অ্যানফিল্ড ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ক্লাব কর্তৃপক্ষও এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করে তাকে ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যা ভক্ত-সমর্থকদের আবেগে নতুন ঢেউ তুলেছে।
২০১৭ সালে তুলনামূলকভাবে অল্প পরিচিত একজন ফুটবলার হিসেবে হল সিটি থেকে লিভারপুলে যোগ দেন রবার্টসন। সেই সময় অনেকেই তার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি শুধু সেই প্রশ্নের জবাবই দেননি, বরং ক্লাব ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে ফেলেছেন।
লিভারপুলের হয়ে নয়টি মৌসুমে ৩৭৩টি ম্যাচ খেলা এই লেফট-ব্যাক দলের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম স্থপতি। তার সময়েই ক্লাবটি প্রিমিয়ার লিগ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, এফএ কাপ, লিগ কাপ এবং ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপসহ একাধিক বড় শিরোপা জিতেছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে লিভারপুলকে আবার ইংল্যান্ডের শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার পেছনে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
ক্লাবের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এই গ্রীষ্মেই দল ছাড়বেন স্কটল্যান্ডের অধিনায়ক। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, রবার্টসন শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং দলের সংস্কৃতি, মানসিকতা এবং লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তার অবদানকে সম্মান জানিয়ে তাকে ‘সত্যিকারের কিংবদন্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবলের বাস্তবতা বদলেছে। নতুন খেলোয়াড়দের আগমন এবং কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে চলতি মৌসুমে রবার্টসনের নিয়মিত একাদশে জায়গা কমে যায়। ৩২ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার এ মৌসুমে মাত্র ১৫টি ম্যাচে শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েছেন, যা তার ক্যারিয়ারের তুলনায় বেশ কম।
এদিকে গত জানুয়ারিতে টটেনহাম হটস্পারে সম্ভাব্য দলবদল নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তবে দলের রক্ষণভাগে চোট সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি লিভারপুলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং মৌসুম শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেন।
বিদায়ের ঘোষণা দিতে গিয়ে রবার্টসনের কণ্ঠে ছিল আবেগের ছোঁয়া। তিনি বলেন, লিভারপুলের মতো একটি ক্লাব ছেড়ে যাওয়া কখনোই সহজ নয়। গত নয় বছর তার এবং তার পরিবারের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই ক্লাব। কিন্তু ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী পরিবর্তন আসবেই, আর সেই পরিবর্তন মেনে নিয়েই তাকে সামনে এগোতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এই ক্লাবের জন্য তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন এবং তাতে তার কোনো আক্ষেপ নেই। একজন খেলোয়াড় হিসেবে যেমন তিনি এখানে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, তেমনি একজন মানুষ হিসেবেও বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন। লিভারপুল এবং এর সমর্থকরা সবসময় তার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রবার্টসনের ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে খেলা। শুরুতে প্রথম একাদশে জায়গা পেতে কিছুটা সময় লাগলেও পরে তিনি ক্লপের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। তার আক্রমণাত্মক খেলা, নির্ভুল ক্রস এবং রক্ষণে দৃঢ়তা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাকে পরিণত করে।
যদিও ক্লাব তাকে কিংবদন্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, তবে নিজেকে সে জায়গায় দেখতে চান না রবার্টসন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, তিনি কখনোই নিজেকে কিংবদন্তি বলবেন না। তবে এই গর্ব অবশ্যই থাকবে যে, তিনি এমন একটি দলের অংশ ছিলেন, যারা লিভারপুলকে আবার সাফল্যের শিখরে ফিরিয়ে এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রবার্টসনের বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের প্রস্থান নয়, বরং একটি সফল যুগের সমাপ্তি। তার মতো নিবেদিতপ্রাণ এবং ধারাবাহিক পারফরমার খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য তিনি একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবেন।
লিভারপুল সমর্থকদের জন্য এই বিদায় নিঃসন্দেহে আবেগঘন মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের প্রিয় খেলোয়াড়কে বিদায় জানানোর কষ্ট যেমন আছে, তেমনি তার অবদানের জন্য গর্বও রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায়ে রবার্টসন কোন ক্লাবে যোগ দেন এবং কীভাবে নিজের ফুটবল যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যান।
সব মিলিয়ে, অ্যানফিল্ডে অ্যান্ডি রবার্টসনের সময়টা ছিল সাফল্য, সংগ্রাম এবং গৌরবের এক অনন্য গল্প, যা দীর্ঘদিন ধরে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।