আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসে অর্থনীতিতে মিশ্র সংকেত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৩ বার
বাংলাদেশ অর্থনীতি আইএমএফ পূর্বাভাস বিশ্লেষণ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সাম্প্রতিক গতিপথ নিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) এক নতুন পূর্বাভাস দিয়েছে, যেখানে একদিকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলা হলেও অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপ বাড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার কারণে আগামী কয়েক বছরে দেশের আর্থিক ভারসাম্যে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এই মূল্যায়ন দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে সরকারের রাজস্ব আয় সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে একই সময়ে সরকারের মোট ব্যয়ও বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি আরও বড় হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব আহরণ বাড়লেও তা ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়, জিডিপির অনুপাতে বাজেট ঘাটতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আগামী অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে সাড়ে ৪ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা গ্রহণ করতে হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আহরণ জিডিপির ৭ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং আগামী অর্থবছরে আরও সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৯ শতাংশের ওপরে যেতে পারে। তবে এই প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত হলেও তা দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে বাড়তি ব্যয়ের তুলনায় এখনও কম বলে মনে করছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে সরকারি ব্যয়ের চাপও ক্রমাগত বাড়ছে। গত অর্থবছরে মোট ব্যয় কিছুটা কমে ১১ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও আমদানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সম্প্রসারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

International Monetary Fund তাদের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে যে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ আগের ঋণ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন ঋণ গ্রহণ করেও উন্নয়নমূলক খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের সামাজিক খাতে যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। এতে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং জনসেবার মানেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

আইএমএফের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। নির্বাচিত সরকারের অধীনে নীতিগত ধারাবাহিকতা থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং কর ব্যবস্থার আরও কার্যকর বাস্তবায়ন।

প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে পূর্ববর্তী সরকারের শুরু করা কিছু রাজস্ব সংস্কার কর্মসূচি যদি বর্তমান সরকার অব্যাহত রাখে, তাহলে মধ্যম মেয়াদে রাজস্ব আহরণে উন্নতি সম্ভব। তবে সেই সংস্কার কার্যক্রমের গতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা এখন বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি দেশের আমদানি খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেট ভারসাম্য রক্ষা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু রাজস্ব বৃদ্ধি নয়, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোও সমানভাবে জরুরি। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার উৎপাদনশীল খাতে নিশ্চিত করা না গেলে ঋণের চাপ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

সামগ্রিকভাবে আইএমএফের এই পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও অন্যদিকে ঘাটতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণ নির্ভরতা অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে সঠিক নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নই আগামী দিনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত