২০২৭ সালের মধ্যে রাখাইন দখলের ঘোষণা আরাকান আর্মির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৯ বার
২৭ সালের মধ্যে রাখাইন দখলের ঘোষণা আরাকান আর্মির

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাখাইন রাজ্যকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। সংগঠনটির সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল ত্বান ম্রাত নাইং সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তারা রাখাইন রাজ্যে “চূড়ান্ত বিজয়” অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ঘোষণা ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংগঠনটির ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ত্বান ম্রাত নাইং বলেন, তারা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন এবং মিয়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও দাবি করেন, তাদের লড়াই শুধু সামরিক নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও।

প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে রাখাইন রাজ্য জুড়ে ব্যাপক সামরিক অগ্রগতি অর্জন করেছে আরাকান আর্মি। এই সময়ের মধ্যে তারা ১৪টি টাউনশিপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে এবং দক্ষিণ চিন রাজ্যের পালেতওয়া টাউনশিপেও প্রভাব বিস্তার করেছে। বর্তমানে রাখাইনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি এলাকা—সিত্তে, কিয়াউকফিউ এবং মানাউং—এখনও মিয়ানমার জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সংগঠনটির মতে, তারা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। আদালত, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার কথাও তারা উল্লেখ করেছে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের বর্তমান সংঘাত পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে, যেখানে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে সক্রিয়। এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার–এর সামরিক জান্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

আরাকান আর্মির এই উত্থান শুরু হয় বিশেষ করে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে, যখন তারা বড় পরিসরে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর আগে শান রাজ্যে “অপারেশন ১০২৭” নামের একটি সমন্বিত বিদ্রোহী অভিযান শুরু হয়, যার প্রভাব পরে রাখাইন অঞ্চলেও পড়ে। ওই অভিযানের অংশ হিসেবে আরাকান আর্মিও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, তাদের এই অভিযানের সময় তারা কেবল সামরিক জয় নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসন গড়ে তুলতেও সক্ষম হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই ধরনের সংঘাতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বহু এলাকা এখনো বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীতে ভরে আছে।

সাম্প্রতিক বক্তব্যে ত্বান ম্রাত নাইং জোর দিয়ে বলেন, তাদের লড়াই মিয়ানমারের দমনমূলক সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং তারা মিত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তাদের আন্দোলন এখন একটি “অপরিবর্তনীয় জাতীয় সংগ্রামে” রূপ নিয়েছে।

এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুধু আরাকান আর্মিই নয়, বরং আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি এবং আরও কয়েকটি প্রতিরোধ সংগঠন। রাজনৈতিকভাবে গঠিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)–এর পক্ষ থেকেও শুভেচ্ছা বার্তা এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের সমর্থন বার্তা মিয়ানমারের বিদ্রোহী রাজনীতির জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। একইসঙ্গে এটি জান্তা সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

আরাকান আর্মির ইতিহাস শুরু হয় ২০০৯ সালের ১০ এপ্রিল। তখন মিয়ানমার-চীন সীমান্তবর্তী লাইজা অঞ্চলে মাত্র ২৬ জন সদস্য নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় বলে জানা যায়। শুরুতে সীমিত অস্ত্র ও জনবল নিয়ে গড়ে ওঠা এই গোষ্ঠী এখন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সশস্ত্র শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন অঞ্চল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি প্রকল্প এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য রুটের কারণে এই অঞ্চল আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য আরাকান আর্মি ঘোষণা করেছে, তা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের সামরিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং আঞ্চলিক শক্তির অবস্থানের ওপর।

এদিকে জান্তা সরকার এখনো তাদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিমান হামলা ও নৌ অভিযানের মাধ্যমে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে এই সংঘাতে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে।

সব মিলিয়ে রাখাইনকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের বর্তমান সংঘাত নতুন এক মোড়ে পৌঁছেছে। আরাকান আর্মির ঘোষিত সময়সীমা এবং সামরিক অগ্রগতি ভবিষ্যতে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত