অপরিশোধিত তেল সংকটে বন্ধ দেশের একমাত্র শোধনাগার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার
দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার বন্ধ ঘোষণা

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের জ্বালানি খাতে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে অপরিশোধিত তেল সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড। সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে সর্বশেষ পরিশোধন কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পরই কারখানাটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ সংকট চলছিল। বিশেষ করে আমদানি ব্যাহত হওয়ায় কাঁচা তেলের মজুদ ক্রমেই কমে আসে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কারখানাটিতে দৈনিক স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

ইস্টার্ন রিফাইনারি সাধারণত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করে থাকে। তবে সরবরাহ সংকটের কারণে গত মাসে উৎপাদন কমিয়ে আনা হয় এবং দৈনিক পরিশোধন ৩ হাজার ৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে মজুদ আরও কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হয়।

কর্মকর্তারা জানান, বন্ধ হওয়ার আগে সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা প্রায় ৫ হাজার টন তেল এবং ট্যাংকের তলানিতে থাকা “ডেড স্টক” ব্যবহার করে পরিশোধন কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেই মজুদও পর্যাপ্ত ছিল না।

বর্তমানে দেশের অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হলেও এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানো হয়। ফলে এই শোধনাগার বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করেছে যে দেশে বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তাই আপাতত সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের সংকট বা বিঘ্ন ঘটবে না বলে জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অপরিশোধিত তেল সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা স্থানীয় পর্যায়েও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এই সংকট আরও গভীর হয়েছে।

সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে তেল আমদানির ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত শোধনাগারের কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানি করা তেলই প্রধান উৎস। এই পরিস্থিতিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল, মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক রিফাইনারি প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নতুন একটি অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেই সরবরাহ নিশ্চিত হলে শোধনাগারটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ইস্টার্ন রিফাইনারির মতো একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহে প্রভাব না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব বড় হতে পারে।

সব মিলিয়ে অপরিশোধিত তেল সংকটের কারণে ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ হওয়া দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত