প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল-২০২৬’ পাসকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই বিল পাস প্রক্রিয়াকে ঘিরে সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, রাজনৈতিক সমঝোতা ও পূর্ববর্তী ঐকমত্য ভঙ্গ করে ‘ছলচাতুরী ও জোচ্চুরির মাধ্যমে’ বিলটি পাস করা হয়েছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের পর আলোচনায় অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গৃহীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। সেই ঐকমত্য অনুযায়ী এসব বিল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সংসদে উপস্থাপন করে পাস করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সংশোধনী আনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, বিরোধী দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ৯৮টি বিলে কোনো আপত্তি তোলা হবে না। কিন্তু সরকারের আচরণ সেই প্রতিশ্রুতির প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেছে। তিনি আরও বলেন, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যেকোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে বিশেষ কমিটি বা আলোচনার কোনো প্রয়োজন থাকে না। তার মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ সংসদীয় শিষ্টাচারের পরিপন্থি।
বিলের সংশোধনী অংশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে আগে একজন বিশেষজ্ঞকে রাখার বিধান ছিল। তার মতে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্মৃতি সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পথ খুলে দেবে।
তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে দলীয়করণের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং এমনকি ক্রীড়া সংস্থাগুলোতেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদাহরণ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে গঠিত একটি জাদুঘরও যদি একই পথে পরিচালিত হয়, তাহলে তা ইতিহাস সংরক্ষণের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, এই জাদুঘরটি শুধুমাত্র একটি স্থাপনা নয়, বরং গত ১৬ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসের প্রতীক। সেখানে সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও স্মৃতিকে সম্মান জানানো উচিত ছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়েছে, যা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, যদি পূর্বের ঐকমত্য অনুযায়ী বিলটি পুনর্বিবেচনা না করা হয়, তাহলে সংসদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ অর্থহীন হয়ে পড়বে। তার মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি, একতরফা সিদ্ধান্ত নয়।
অন্যদিকে, বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। এতে সংসদের ভেতরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। তারা মনে করছেন, স্মৃতি জাদুঘরের মতো সংবেদনশীল একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামো নিয়ে বিতর্ক ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিল পাসকে ঘিরে সংসদে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি আইনগত বিষয় নয় বরং রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন হিসেবেও সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও বিরোধী দল পরবর্তী সময়ে এই বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না।