ময়মনসিংহ মেডিকেলে হামে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩৭ বার
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হামে ৩ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আবারও হামের প্রকোপে শোকাবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৯টার মধ্যে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নতুন করে তিন শিশুর মৃত্যুর পর হাসপাতালটিতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ জনে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে দুইজন ছেলে এবং একজন মেয়ে। প্রত্যেকেই আলাদা সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি শিশু ছিল মাত্র সাত মাস বয়সী, যাকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা থেকে গত ২২ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার বিকেল ৫টার দিকে শিশুটির মৃত্যু হয়। একই দিনে সন্ধ্যায় চার মাস বয়সী এক মেয়ে শিশুর মৃত্যু হয়, যেটি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা থেকে ২৩ এপ্রিল ভর্তি করা হয়েছিল। আরেকটি পাঁচ মাস বয়সী শিশু নেত্রকোনার দুর্গাপুর থেকে ভর্তি হওয়ার পর সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মৃত্যুবরণ করে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের বেশিরভাগই জটিল শ্বাসকষ্ট, জ্বর, র‍্যাশ এবং সংক্রমণজনিত নানা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। অনেকের শারীরিক অবস্থা হাসপাতালে আসার সময়ই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল বলে চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৭৪ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩২ শিশু ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৬ জন শিশু।

চলমান পরিস্থিতিতে হাসপাতাল প্রশাসন জানায়, গত ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ৯২৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩১ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে অবশিষ্ট রোগীদের মধ্যে কিছু শিশুর অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো টিকা গ্রহণ না করা হলে এই রোগ মারাত্মক জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিলম্বিত চিকিৎসা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চাপ বেড়েছে। পর্যাপ্ত শয্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রোগীদের আলাদা ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে যাতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে না পড়ে।

স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হামের এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে। যেসব এলাকায় শিশুদের টিকা কম দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করতে এবং অসুস্থতা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে।

এদিকে, শিশু মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় এলাকাগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারগুলো তাদের প্রিয় সন্তানদের হারিয়ে গভীর শোকাহত। হাসপাতাল এলাকায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা নয়, জনসচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা কার্যক্রম আরও জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতাল প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানা গেছে। তবে শিশু মৃত্যুর ধারাবাহিকতা জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নতুন নতুন রোগী ভর্তি এবং মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত