প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ন্যায়বিচারকে মানবিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে হলে ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিচারপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রে প্রকৃত মানবিকতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সরকারি খরচে বিরোধ নিষ্পত্তি, সবার আগে বাংলাদেশ’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে কেউ যেন বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। তিনি বলেন, বিচারপ্রাপ্তি কেবল ধনীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, এটি হতে হবে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সমাজে অনেক মানুষ আছেন যারা দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা মামলার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অবগত নন। তার ভাষায়, কারাগারে থাকা একটি বড় অংশের মানুষ বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।
বক্তব্যে তিনি অতীতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অনেক মানুষ বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বিচার ব্যবস্থার ইতিহাস ও আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে দেশে সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখেরও বেশি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান সরকারের সময়েও এই কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। দেশের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে আইনি সেবা নিশ্চিত করতে আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি রাষ্ট্র তখনই মানবিক হয়ে ওঠে, যখন তার বিচার ব্যবস্থা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও।
তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। ন্যায়বিচার ছাড়া গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রে অস্থিরতা তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানে তিনি আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের উপকারভোগীদের অভিজ্ঞতা শোনেন। পাশাপাশি জুলাই মাসে সংঘটিত ঘটনাগুলোর সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং আইনগত সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যও মনোযোগ দিয়ে শোনেন। এসব অভিজ্ঞতা তাকে আরও কার্যকর ন্যায়বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে ২০২৬ সালের সেরা কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সায়েম খানের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত অতিথিরা আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং এর কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দিবসটি উপলক্ষে দেশজুড়ে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে আইনগত অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিচার ব্যবস্থায় আইনগত সহায়তা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বিচার ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা বাড়াতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে তারা মনে করেন। বিশেষ করে সচেতনতার অভাব, দীর্ঘসূত্রতা এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ এই সেবা থেকে পুরোপুরি উপকৃত হতে পারছেন না।
সব মিলিয়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দেশের বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।