নাগরিকত্বের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দিলে ভিসা আবেদন বাতিল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩৬ বার
নাগরিকত্ব পেতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দিলে ভিসা আবেদন বাতিল

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবণতা বা তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নিয়ে নতুন করে কড়াকড়ি অবস্থান নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন ও দেশটির কনস্যুলার নীতিমালা। এ ধরনের উদ্দেশ্যে ভিসার অপব্যবহার করা হলে আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হবে বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। বিষয়টি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে ভিসা নীতি ও অভিবাসন ব্যবস্থার কঠোরতা নিয়ে।

বুধবার সকালে ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক পোস্টে বলা হয়, কনস্যুলার কর্মকর্তারা যদি নিশ্চিত হন যে কোনো আবেদনকারীর মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে সেই শিশুর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা, তাহলে সংশ্লিষ্ট ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে। একই সঙ্গে আবেদনকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা ভিসা আবেদনে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন এবং কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান না করেন।

দূতাবাসের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আবারও জোরালো হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী প্রায় সকল শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পেয়ে থাকে। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি বিভিন্ন নীতিনির্ধারকের। বিশেষ করে পর্যটন ভিসা ব্যবহার করে গর্ভবতী নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে অভিবাসন নীতি কঠোর করার দাবিও ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা গর্ভবতী নারীদের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে বা এ ধরনের ‘বার্থ ট্যুরিজম’ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের মতে, এই ধরনের কার্যক্রম করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং অভিবাসন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি কোনোভাবেই অপব্যবহার বা ভিসা-ভিত্তিক নাগরিকত্ব অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো বৈধ ভ্রমণ ও অভিবাসনকে উৎসাহিত করা, কিন্তু ভিসার অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব একটি দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক অধিকার হলেও এটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিতর্কিত একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অভিবাসন চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে এই নীতি নিয়ে ভিন্নমত আরও স্পষ্ট হয়েছে। কিছু নীতিনির্ধারক মনে করেন, এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে মানবাধিকার ও অভিবাসন বিষয়ক সংগঠনগুলো মনে করে, ভিসা নীতি কঠোর করার নামে বৈধ ভ্রমণকারীদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। তাদের মতে, কেউ যদি বৈধভাবে ভিসা নিয়ে ভ্রমণ করেন, তাহলে তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সাম্প্রতিক বার্তাটি বাংলাদেশি ভিসা আবেদনকারীদের মধ্যেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যারা পর্যটন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিসা বিশেষজ্ঞদের মতে, আবেদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভিসা প্রসেসিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কনস্যুলার কর্মকর্তারা এখন আবেদনকারীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আর্থিক সক্ষমতা, পূর্ববর্তী ভ্রমণ ইতিহাস এবং অন্যান্য তথ্য আরও গভীরভাবে যাচাই করছেন। ফলে কোনো ধরনের অসংগতি ধরা পড়লে ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশগুলোর অভিবাসন নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও কঠোর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সহজ নয়, কারণ এটি সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। তাই প্রশাসন মূলত ভিসা অপব্যবহার রোধ এবং কনস্যুলার পর্যায়ে যাচাই-বাছাই কঠোর করার ওপর জোর দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এই সতর্কবার্তা অভিবাসন নীতির একটি নতুন কঠোর পর্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি একদিকে যেমন ভিসা আবেদনকারীদের জন্য সতর্কতা হিসেবে কাজ করবে, অন্যদিকে বৈধ ভ্রমণ ও অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও ডেটা-ভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থার দিকে এগোবে, যেখানে ভিসা অনুমোদনের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত