প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খুলনার ডুমুরিয়ায় বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত যেন এবার এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প বলছে। সোনালি ধানে ভরে উঠেছে মাঠ, কৃষকের ঘরে ওঠার কথা ছিল হাসি। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। বাম্পার ফলনের আনন্দ মুছে দিয়ে একসঙ্গে তিনটি সংকট কৃষকদের জীবনকে করে তুলেছে অনিশ্চিত—শ্রমিকের অভাব, ধানের দরপতন এবং আকস্মিক বৃষ্টিতে ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা। ফলে স্বপ্নভরা মৌসুমটি এখন অনেকের কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
চলতি মৌসুমে ডুমুরিয়া উপজেলায় বোরো ধানের উৎপাদন নিয়ে আশাবাদ ছিল তুঙ্গে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মতো এবারও প্রায় ২১ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা এবং রোগবালাইয়ের অনুপস্থিতির কারণে ফলন হয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এবার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু এই সাফল্যই যেন এখন কৃষকদের জন্য নতুন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধান পেকে মাঠে ঝুঁকে পড়েছে, কিন্তু তা ঘরে তুলতে পারছেন না অনেকেই। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক সংকট। ধান কাটার ভরা মৌসুমেও মাঠে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা পাওয়া যাচ্ছে, তাদের মজুরি আকাশচুম্বী। বর্তমান বাজারে একজন শ্রমিককে দিনে ১২০০ টাকা দিয়েও কাজ করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ বাজারে এক মণ ধানের দাম ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি মেটানো যাচ্ছে না।
এই কঠিন সমীকরণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাঠে নেমেছেন। স্ত্রী-সন্তানসহ সবাই মিলে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার তুলনামূলক কম মজুরির কারণে নারী শ্রমিকদের কাজে লাগাচ্ছেন। তবে নারী শ্রমিকরাও তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘোনা গ্রামের মাঠে কাজ করা শ্রমিক আলেয়া বেগম ও সুফিয়া খাতুনের মতো অনেকেই জানান, তারা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পুরুষদের মতোই কঠোর পরিশ্রম করেন, কিন্তু মজুরি পান কম। এই বৈষম্য তাদের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তবুও সংসারের প্রয়োজনে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
এরই মধ্যে নতুন করে বিপদের বার্তা নিয়ে এসেছে টানা দুই দিনের বৃষ্টি। উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে জমে থাকা পানিতে ডুবে গেছে পাকা ধানের ক্ষেত। ডুমুরিয়া সদর, খর্ণিয়া, আটলিয়া, ভান্ডারপাড়া, শরাফপুর, রঘুনাথপুরসহ একাধিক এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক জমিতে ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও শুধু ধানের শীষগুলো পানির ওপরে ভেসে আছে। এতে করে কৃষকদের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।
যদিও কৃষি বিভাগ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেনি, তারা জানিয়েছে মাঠ পর্যায়ে সার্ভে চলছে। তবে কৃষকদের চোখে সেই হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বকুলতলা গ্রামের কৃষক পরিমল মণ্ডল তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, দুই বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করতে গিয়ে তার প্রায় ৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এবার ফলন ভালো হওয়ায় তিনি প্রায় ১২ মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন। কিন্তু ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনসহ শ্রমিক খরচ প্রায় ৪ হাজার টাকা লাগবে। সব হিসাব মিলিয়ে তার হাতে খুব বেশি লাভ থাকবে না। তিনি বলেন, “ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু লাভ নাই। খরচই উঠে আসা কঠিন।”
শরাফপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের শেখ জানান, তাদের এলাকায় শ্রমিক সংকট এতটাই তীব্র যে অনেক ক্ষেতেই ধান পেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। তিনি বলেন, “এত কষ্ট করে চাষ করলাম, এখন যদি ধান ঘরে তুলতে না পারি, তাহলে সব শেষ।”
থুকড়া গ্রামের কৃষক জবেদ আলী সানা জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। পুরুষ শ্রমিক না পাওয়ায় তিনি নারী শ্রমিক দিয়ে ধান কাটছেন। তিনি বলেন, “যতদিন দেরি হবে, তত ক্ষতি বাড়বে। তাই যা পাই, তাই দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। খুলনা জেলার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. নজরুল ইসলাম জানান, বোরো মৌসুমে এবার উৎপাদন ভালো হলেও শ্রমিক সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে যে সমস্যাগুলো হচ্ছে, তা মোকাবিলায় মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষকদের এই ত্রিমুখী সংকট শুধু একটি মৌসুমের সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের কৃষি ব্যবস্থার কিছু মৌলিক দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। শ্রমিকের অভাব, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া—এই তিনটি সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতায় কৃষকদের জন্য প্রয়োজন তাৎক্ষণিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিশেষ করে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রমিক সংকট মোকাবিলা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
খুলনার ডুমুরিয়ার মাঠে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, কৃষক শুধু ফসল ফলান না, তিনি একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তোলেন। সেই কৃষকই যদি নিজের উৎপাদিত ফসল ঘরে তুলতে না পারেন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
বাম্পার ফলনের এই মৌসুমে তাই কৃষকের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব শুধু তার একার নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার। এখন প্রশ্ন একটাই—এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কত দ্রুত খুঁজে পাওয়া যাবে।