বায়ুদূষণে শীর্ষে দিল্লি, ঢাকার অবস্থান পঞ্চম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
বায়ুদূষণে শীর্ষে দিল্লি, ঢাকার অবস্থান পঞ্চম

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক বায়ুমান সূচকে দেখা গেছে, দূষণের দিক থেকে আবারও শীর্ষে উঠে এসেছে ভারতের রাজধানী Delhi। একই তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী Dhaka রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে, যা দেশের জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা IQAir প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির বায়ুমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ছিল ১৬০। এই স্কোর অনুযায়ী শহরটির বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে রয়েছে। এর ঠিক পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিশরের রাজধানী Cairo, যার স্কোর ১৫১। তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের Lahore, যেখানে AQI ছিল ১২৯।

এই তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ঢাকা, যার বায়ুমান স্কোর ১২৪। অর্থাৎ এখানকার বাতাসও ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বায়ুমান সূচক বা AQI মূলত বাতাসে থাকা ক্ষতিকর কণার মাত্রা পরিমাপ করে একটি নির্দিষ্ট স্কোর নির্ধারণ করে। সাধারণত ০ থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ভালো ধরা হয়, ৫১ থেকে ১০০ হলে তা সহনীয়। কিন্তু ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা সংবেদনশীল মানুষের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত হয়। আর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা সরাসরি অস্বাস্থ্যকর। এর ওপরে গেলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং আবর্জনা পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড বায়ুর মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ঢাকার ক্ষেত্রেও এই সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান, যা ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

ঢাকার বাতাসে সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা PM2.5-এর মাত্রা প্রায়ই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এই কণাগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে সহজেই শ্বাসনালীর মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হৃদরোগ এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন।

অন্যদিকে দিল্লির পরিস্থিতিও একইভাবে ভয়াবহ। বিশেষ করে শীত মৌসুমে সেখানে বায়ুদূষণ চরমে পৌঁছায়। যানবাহনের ধোঁয়া, কারখানার নির্গমন, ইটভাটা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর কারণে বাতাসে বিষাক্ত কণার মাত্রা বেড়ে যায়। একই ধরনের সমস্যা লাহোর এবং কায়রোতেও বিদ্যমান।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এই সমস্যা কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। সীমান্ত পেরিয়ে বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে, ফলে আঞ্চলিক সমন্বয় ছাড়া এর কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। তারা আরও মনে করেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, ব্যক্তিগত সচেতনতা ও আচরণগত পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি।

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ কমাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন পুরনো যানবাহন অপসারণ, ইটভাটার আধুনিকীকরণ, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং সবুজায়ন বৃদ্ধি। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, যখন বায়ুর মান খারাপ থাকে তখন অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করা এবং শিশু ও বয়স্কদের বিশেষভাবে সতর্ক রাখা জরুরি। একই সঙ্গে ঘরের ভেতর বায়ু পরিশোধনের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বায়ুর মান উন্নয়ন এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই সময়ের দাবি—সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং সর্বস্তরের মানুষের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা।

ঢাকার পঞ্চম অবস্থান হয়তো প্রথম দেখায় কিছুটা স্বস্তির মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই অবস্থানও মোটেই নিরাপদ নয়। বরং এটি একটি সতর্ক সংকেত, যা আমাদের এখনই সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত