প্রকাশ: ২৫ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে এখন আর শুধু বোমার আতঙ্ক নয়—মানুষ লড়ছে পেটের ক্ষুধার সাথেও। ন্যূনতম খাবারটুকু থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে গাজাবাসী। একদিকে দিনরাত চলছে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা ও শেলিংয়ের নিরবিচার হামলা, অন্যদিকে বন্ধ প্রায় সব খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ। ফলে গাজার প্রতিটি গলিতে-গলিতে এখন দেখা যাচ্ছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য—ক্ষুধায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছে মানুষ। এই করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে (DW)।
ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় এখন ত্রাণ ট্রাকের প্রবেশ কার্যত নিয়ন্ত্রিত। সীমিতসংখ্যক যে কয়েকটি ত্রাণবাহী ট্রাক ঢুকছে, তা এতটাই অপ্রতুল যে, তা দিয়ে ২০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবনের জন্য ন্যূনতম চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এর ফলে বহু গাজাবাসী দিন পার করছেন উপবাসে, অনেকেই পড়েছেন শারীরিক জীর্ণতার চরম পর্যায়ে।
গাজাবাসী রাইদ আল-আথামনা নামের এক বাসিন্দা ডয়চে ভেলেকে ফোনে জানান, “সারাদিন শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় মাথায়—আজ কী খাব? পরিবারকে কী খাওয়াব?”
ক ooitএকসময় বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। এখন সেই পথও বন্ধ। কারণ, ইসরায়েল বিদেশি সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বহু আগেই। ফলে কোনো কাজ নেই, নেই আয়ের কোনো উৎস।
আথামনা আরও বলেন, “আমাদের এখানে কোনো খাবার নেই। সামান্য আটা, ডাল এমনকি এক টুকরো রুটির জন্যও যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আজ ভাগ্য ভালো ছিল বলে স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য একটু ডাল জোগাড় করতে পেরেছি। কিন্তু কাল কী হবে জানি না।”
তার ভাষায়, গাজায় আজ কেউই নিরাপদ নয়। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে কোথাও না কোথাও বোমা পড়ছে। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে, ঘুমাতে গিয়ে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতেও মানুষ আতঙ্কে থাকে। আর এই আতঙ্কের মধ্যেই চলছে ক্ষুধার সঙ্গে এক অসম যুদ্ধ। “আমি নিজের চোখে দেখেছি—মানুষ রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছে। ক্ষুধায় শরীরের শক্তি হারিয়ে ফেলছে।”
গাজার এমন করুণ পরিস্থিতির বর্ণনা শুধু কোনো একজন রাইদের কণ্ঠেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ভাইরাল এমন অসংখ্য ভিডিও যেখানে দেখা যাচ্ছে, শিশু-বৃদ্ধ সবাই খাদ্যের আশায় অসহায়ভাবে ছুটে চলেছে। কারও মুখে এক টুকরো রুটি নেই, কারও কাছে নেই এক মুঠো চাল।
গত মে মাসে তিন মাসের দীর্ঘ অবরোধের পর ইসরায়েল সাময়িকভাবে কিছু ত্রাণ ঢুকতে দিয়েছিল গাজায়। তখন মনে হয়েছিল পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলাবে। কিন্তু আজ দুই মাস না যেতেই সেই আশার প্রদীপ নিভে গেছে। এখন অবরোধ যেন আরও কঠোর, ত্রাণের প্রবাহ আরও সংকুচিত।
আথামনা বলেন, “আমি আমার নাতি-নাতনিদের নিয়ে থাকি। ওরা দিনরাত কাঁদছে খিদের জ্বালায়। একটুখানি খাবার দিতে না পারার বেদনায় বুকটা ফেটে যায়। কীভাবে এই শিশুদের সামনে মুখ তুলব, জানি না।”
বিশ্ব যখন প্রযুক্তি ও আধুনিকতার চূড়ায় পৌঁছেছে, তখন গাজার মতো একটি ভূখণ্ডে মানবতা ধুঁকছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। খাবারের জন্য যদি রাস্তায় মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়, শিশুর কান্না যদি খাদ্য না পায়, তবে সেই সভ্যতা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতেই হয়—এ কোন উন্নয়ন, এ কিসের ন্যায়?
আজ গাজার প্রতিটি মানুষের চোখে একটাই প্রার্থনা—যেন আবারও তারা পেটভরে খেতে পারে। এই মৌলিক অধিকারটুকু ফিরে পাওয়ার আশা নিয়েই তারা কাটিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি দিন। বিশ্ব বিবেক কি এবারও নীরব থাকবে?