প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নতুন অর্থবছরের শুরুতেই ধাপে ধাপে এই বেতন কাঠামো কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে।
তিনি বলেন, সরকার চেষ্টা করছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করতে, যাতে একদিকে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে। তবে বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে বেতন কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তিনি স্বীকার করেন।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন পে স্কেল কার্যকর করার বিষয়ে নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে আগামী বাজেটে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হবে, যাতে প্রাথমিকভাবে বেতন কাঠামোর একটি অংশ কার্যকর করা যায়।
এ বিষয়ে সরকারিভাবে আরও জানা গেছে, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো বেতন কাঠামো একবারে কার্যকর না করে তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ বৃদ্ধি করা হবে, এরপর পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অংশ যুক্ত করা হবে এবং শেষ ধাপে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সম্পূর্ণভাবে সমন্বয় করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় না হওয়ায় একসঙ্গে বড় ধরনের ব্যয়ভার গ্রহণ করা সম্ভব নয়। ফলে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাজেট প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে, যা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে যে বেতন কাঠামো বিদ্যমান, সেখানে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কিছুটা কমিয়ে আনার প্রস্তাবও আলোচনায় আছে। এতে করে বেতন কাঠামো আরও সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পুরো কাঠামো বাস্তবায়নে এক লাখ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হতে পারে। এর সঙ্গে পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত হলে ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে সরকার বলছে, এই ব্যয় ধীরে ধীরে সামাল দেওয়ার মতো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে সরকারি খাতে কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর চাপও বাড়তে পারে। তাই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে স্কেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশা ছিল। প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে বেতন কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন না আসায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। বিশেষ করে মধ্যম ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা এই পরিবর্তনের জন্য বেশি অপেক্ষা করছিলেন।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে বাজারে ভোগব্যয় বাড়বে, যা স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক চাহিদা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়।
অন্যদিকে প্রশাসনিক পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সরকারি খাতে কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং সেবার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।
সব মিলিয়ে ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে বাস্তবায়নের ধাপ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এর পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা পেতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারও বলছে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে।