প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে উদ্ভূত সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় এবার মামলা করেছে পুলিশ। ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার পর গাজীপুর সদর থানায় দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনাটি ঘিরে ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলে থাকলেও ছোট গেট দিয়ে সীমিতভাবে জরুরি প্রয়োজনে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের যাতায়াত অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পূর্বঘোষিত ব্লকেড কর্মসূচিও চলছে, যদিও মঙ্গলবার নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৪ মে সরকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করেই ডুয়েট ক্যাম্পাসে শুরু হয় অসন্তোষ ও প্রতিবাদ। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ দাবি করেন, একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এখানে প্রশাসনিক নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই হওয়া উচিত।
এই দাবিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে আন্দোলন সংগঠিত হয় এবং ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৭ মে, যখন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে যোগ দিতে আসেন। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাকে প্রবেশে বাধা দেয়। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়। সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হন বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
ঘটনার পরদিন ১৮ মে গাজীপুর সদর থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যিনি জানান, সরকারি কাজে বাধা, হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে এই মামলা রুজু করা হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত এই মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে।
এদিকে ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ও অসন্তোষ এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাদের ব্লকেড কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের দাবি পূরণ হয়।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য তারা আন্দোলনে নেমেছেন এবং মামলা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলন থামানো সম্ভব নয়। তাদের মতে, প্রশাসন ও সরকারের উচিত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে সংঘর্ষ ও মামলা-হামলার ঘটনা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে ডুয়েট ক্যাম্পাস এখন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে পুলিশের মামলা ও আইনগত প্রক্রিয়া, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন—এই দুইয়ের মধ্যে আটকে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম।