ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তির বদলে বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
  • ৩ বার
ইরান যুক্তরাষ্ট্র সংকট যুদ্ধ

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন করে ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন আর কূটনৈতিক চাপ বা সীমিত সংঘাতের পর্যায়ে নেই, বরং ধীরে ধীরে তা একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। প্রায় তিন মাস আগে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনার পর এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং সময়কে নিজেদের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই। এই অবস্থানগত অনড়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ কার্যত সংকুচিত হয়ে আসছে।

বর্তমান সংকটের সূত্রপাত ঘটে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক চাপের পর থেকে। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে তা কৌশলগত সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অবরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক নীতিবিশ্লেষকদের প্রধান উদ্বেগ এখন আর কোনো শান্তিচুক্তি হবে কি না, সেটি নয়। বরং তারা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা সামরিক ভুল হিসাব পরিস্থিতিকে দ্রুত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই ধরনের ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভেতরে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। কিছু নীতিনির্ধারকের মতে, চাপ বৃদ্ধি করলে ইরান দুর্বল হয়ে আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হবে। তবে এই কৌশলের বিরুদ্ধে তীব্র মত দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ।

ইসরায়েলের একটি শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এবং দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে সহজে নতি স্বীকার করানো যায় না। তার মতে, এই ধরনের নীতি বারবার ব্যর্থ হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

অন্যদিকে, আঞ্চলিক একটি সরকারি সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি এক ধরনের “ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের” মধ্যে রয়েছে, যেখানে প্রতিদিনই নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থায় কূটনৈতিক অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কেবল সামরিক বা কৌশলগত বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বিষয়। তাদের মতে, এসব থেকে সরে আসা মানে আত্মসমর্পণ, যা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

এদিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা পরোক্ষ আলোচনা হলেও তা কোনো ফলাফল আনতে পারেনি। দুই পক্ষের দাবির মধ্যে ব্যবধান এতটাই বেশি যে আপাতত সমঝোতার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে দীর্ঘমেয়াদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে এবং বিদ্যমান মজুত আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করতে হবে। অন্যদিকে ইরান চায়, তাদের ওপর আরোপিত সব সামরিক চাপ ও হামলার অবসান ঘটাতে হবে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং যুদ্ধজনিত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তেহরান। তবে ওয়াশিংটন এসব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেছেন, সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে এবং চুক্তি না হলে ইরানের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তার এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক আলী ভায়েজ বলেন, উভয় পক্ষই মনে করছে সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে। এই ভুল ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং একটি সমঝোতার সম্ভাবনাকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই সংঘাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ, এখন কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। এই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ার মন্তব্য করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষের পক্ষেই একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না। তার মতে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যক্তিগত অবস্থানগত জটিলতা এই সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী এই উত্তেজনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে সংঘাতের ঝুঁকিই বেশি বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা, আর বিশ্ব তাকিয়ে আছে সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত