আড়াই লাখ মানুষের জন্য মাত্র দুই চিকিৎসক রাজনগরে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ জুলাই, ২০২৫
  • ৬০ বার

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা—সিলেট বিভাগের এক ঐতিহ্যবাহী জনপদ। কিন্তু এই জনপদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র যেন এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে প্রায় আড়াই লাখ মানুষকে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যুগে দাঁড়িয়ে আজও রাজনগরের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসা মাত্র দুইজন চিকিৎসক। অবিশ্বাস্য শোনালেও, এটি নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়, এটি আজ রাজনগরের মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের এক বেদনাদায়ক অনুষঙ্গ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০১৮ সালে ৩১ শয্যা থেকে উন্নীত হয়ে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। অথচ বাস্তবে সেখানে বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ১৯টি শয্যা। পুরনো ভবনের ফাটলের কারণে সেটি ভেঙে ফেলা হয়, আর নতুন ভবন উদ্বোধনের আগেই তড়িঘড়ি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয় রোগীদের। গাইনি অপারেশন থিয়েটার স্থাপিত হলেও, তা এখনো চালু হয়নি শুধুমাত্র জনবল সংকটের কারণে। এমনকি হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে মেশিনটি বিগত ২০ বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার হাল যে কতটা ভয়াবহ, তা আরও স্পষ্ট হয় জনবল পরিসংখ্যান থেকে। যেখানে ২১ জন এমবিবিএস চিকিৎসকের পদ রয়েছে, সেখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২ জন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ শাহরিয়ার মাহমুদ বদলি হওয়ার পর পদটি খালি রয়েছে। তার বদলির বিরুদ্ধে চলমান মামলার কারণে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে, ভারপ্রাপ্ত হিসেবে মেডিকেল অফিসার ডা. গোলাম কিবরিয়া একাই সব দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন। আর তার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন ডা. অসীম কুমার।

এই অপ্রতুল জনবল নিয়েই প্রতিদিন রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ শতাধিক রোগীকে আউটডোরে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। জরুরি বিভাগেও নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক। সেখানে রোগী সামলানোর মূল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন স্যাকমো মো. সোহেল রানা ও তার সহযোগীরা। অথচ এই হাসপাতালের ১৩৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে ৪৩টি পদ শূন্য পড়ে আছে। গাইনি কনসালটেন্ট থাকলেও ল্যাব টেকনিশিয়ান না থাকায় থিয়েটার চালু করা যাচ্ছে না। এনেসথেসিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি বর্তমানে সদর হাসপাতালে প্রেষণে রয়েছেন, ফলে গাইনি বিভাগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

জনবল সংকটের চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায়—ডা. সুভাশিষ গুপ্ত ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, অথচ তার পদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করা হয়নি। একইভাবে, স্যাকমো মুস্তাকুর রহমান পলাশ তিন বছর ধরে বিদেশে থাকলেও তার পদে নতুন কেউ নিয়োগ পাননি। ফলে একদিকে যেমন চিকিৎসা না পেয়ে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়ছে, অন্যদিকে সেই দুর্ভোগের দায় প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রিতায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

এই সংকট নিয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে রাজনগরের দায়িত্বে থাকা ডা. গোলাম কিবরিয়া স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এই জনবল নিয়ে সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। গাইনি বিভাগে ডাক্তার থাকলেও চালাতে পারছি না টেকনিশিয়ান সংকটে।” তার কথায় উঠে আসে স্বাস্থ্যখাতের সেই দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতিচ্ছবি।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, “এটা শুধু রাজনগরের সমস্যা নয়, প্রায় সবখানেই একই অবস্থা চলছে। আমরা চেষ্টা করছি, আশা করছি আগামী তিন মাসের মধ্যে কিছু ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।” যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ‘আশা’ বছরের পর বছর ধরে শুনে আসছেন তারা—কিন্তু বাস্তবতায় পরিবর্তন নেই।

রাজনগরের সাধারণ মানুষ বলছেন—আজ রাজনগরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধুই নামমাত্র। চিকিৎসা নয়, বরং করুণার ওপরই ভরসা করে চলছে মানুষের জীবন। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টি না পড়লে এখানকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আর জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত