প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আজ শুক্রবার (২৬ জুন) পবিত্র আশুরা। ১৪৪৮ হিজরি সনের ১০ মহররম উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ইবাদত, দোয়া এবং শোকানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হচ্ছে। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি একদিকে যেমন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা দেয়, অন্যদিকে সত্য, ন্যায়, আত্মত্যাগ এবং মানবিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও স্মরণীয়। দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসলামী পরিভাষায় ‘আশুরা’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘আশারা’ থেকে, যার অর্থ ‘দশ’। মহররম মাসের দশম দিন হওয়ায় এ দিনকে আশুরা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, এ দিনেই মহান আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) এবং তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ ঘটনার স্মরণে হজরত মুসা (আ.) রোজা পালন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও এই রোজা পালন করেন এবং তাঁর উম্মতকে তা পালনে উৎসাহিত করেন।
সহিহ বুখারির একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখতে পান ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, এই দিনেই আল্লাহ হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন মহানবী (সা.) বলেন, ‘মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দেন। পরে ইহুদিদের রীতির সঙ্গে পার্থক্য রাখার জন্য তিনি আশুরার আগের দিন (৯ মহররম) অথবা পরের দিন (১১ মহররম) মিলিয়ে দুটি রোজা রাখার পরামর্শ দেন।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, আশুরার রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের ছোট গুনাহের কাফফারা হওয়ার আশা করা যায়। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে রোজা পালন করে থাকেন।
তবে ইসলামের ইতিহাসে আশুরা আরেকটি গভীর বেদনাবিধুর ঘটনারও স্মারক। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম বর্তমান ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.), তাঁর পরিবারের সদস্য এবং অল্পসংখ্যক সঙ্গী অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে শাহাদাতবরণ করেন। ইতিহাসে কারবালার এই ঘটনা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষ করে শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে আশুরা গভীর শোকের দিন। কারবালার শহীদদের স্মরণে তারা তাজিয়া মিছিল, দোয়া, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে। বাংলাদেশেও পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনি দালানকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও তাজিয়া মিছিল ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনুষ্ঠানগুলোকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে আশুরা মূলত নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, নফল ইবাদত, দোয়া এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে পালিত হয়। দেশের বিভিন্ন মসজিদে কোরআনখানি, ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় আলোচনা এবং আশুরার তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ বয়ান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এক বাণীতে বলেছেন, আশুরার শিক্ষা মানুষকে অন্যায়, অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি সত্য, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আশুরার চেতনা ধারণ করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও পৃথক বাণীতে বলেন, ইসলামে বিভেদ, বিদ্বেষ, সহিংসতা কিংবা সামাজিক বৈরিতার কোনো স্থান নেই। তিনি আশুরার শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয় জীবনে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি দেশের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ধর্মীয় গবেষকদের মতে, আশুরার মূল শিক্ষা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়; বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, আত্মসংযম চর্চা এবং মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেই এ দিনের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। কারবালার ঘটনা মুসলিম ইতিহাসে আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হলেও একই সঙ্গে এটি মানবতার পক্ষে নৈতিক অবস্থানেরও প্রতীক।
বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে আশুরা উপলক্ষে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসরত মুসলমানরা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দিনটি পালন করছেন। কোথাও ইবাদত ও রোজার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও কারবালার শোকগাঁথা স্মরণে ধর্মীয় সমাবেশ ও শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে প্রশাসন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে তাজিয়া মিছিল ও বড় সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)সহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
পবিত্র আশুরা মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মশুদ্ধি, আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। ইতিহাসের গৌরবময় ও বেদনাবিধুর এই দিনটি আজও মানুষকে সত্য প্রতিষ্ঠা, মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে অনুপ্রেরণা জোগায়। ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে আশুরার শিক্ষা যথাযথভাবে ধারণ করতে পারলেই ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুদৃঢ় হবে।