লোকসান কমাতে ১১ ট্রেন ইজারায় যাচ্ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬
  • ৩ বার

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ । জাতীয় ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ক্রমাগত লোকসান কমানো এবং রেলওয়ের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে অনুমোদনের জন্য রেল সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু মেইল ও লোকাল ট্রেন পরিচালনায় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। পরিচালন ব্যয়, অতিরিক্ত জনবল, টিকিটবিহীন যাত্রা এবং সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় করতে না পারার কারণে এসব ট্রেনে লোকসান বাড়ছে। তাই সেবার মান উন্নয়ন এবং আর্থিক ক্ষতি কমাতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ট্রেনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, পশ্চিমাঞ্চল রেলের আওতায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক, আন্তনগর, মেইল, কমিউটার ও লোকাল মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে কিছু ট্রেন নিয়মিত আয় করলেও বেশির ভাগ মেইল ও লোকাল ট্রেন কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব দিতে পারছে না।

রেলওয়ে সূত্র অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলে ছয়টি আন্তর্জাতিক ট্রেন, ৬২টি আন্তনগর ট্রেন, ৫৫টি মেইল ও কমিউটার ট্রেন এবং ১২টি লোকাল ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে কয়েকটি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নতুন করে আরও ১১টি ট্রেন ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এই উদ্যোগ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে ট্রেন পরিচালনার দায়িত্ব গেলে সেবার মান উন্নত হতে পারে। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, পরিচালন খরচের ভার সামলাতে অপারেটররা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা সাধারণ যাত্রীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের আর্থিক চিত্রও এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক অর্থবছর ধরে রেলওয়ের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পশ্চিমাঞ্চল রেল ৩ কোটি ৭৬ লাখ যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে ৬৪৯ কোটি টাকা আয় করেছে। অথচ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। তবে বছর শেষে আয় দাঁড়িয়েছে ৬২১ কোটি টাকায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৮২৫ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬৬ কোটি টাকা।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু নির্দিষ্ট রুটের ট্রেন ভালো আয় করলেও অনেক মেইল ও লোকাল ট্রেন নিয়মিত লোকসান করছে। রাজশাহী-ঢাকা, ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী-খুলনা এবং রাজশাহী-পার্বতীপুর রুটের কিছু ট্রেন তুলনামূলকভাবে লাভজনক। কিন্তু অনেক স্থানীয় রুটের ট্রেনে যাত্রী থাকলেও সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।

কর্মকর্তাদের মতে, লোকাল ও মেইল ট্রেনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো টিকিটবিহীন যাত্রা। অনেক যাত্রী কাউন্টার থেকে টিকিট না কেটে ট্রেনে উঠে পড়েন। কেউ কেউ ট্রেনের কর্মীদের হাতে সরাসরি টাকা দিয়ে যাতায়াত করেন, ফলে প্রকৃত আয় হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আনসার আলী বলেন, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ট্রেন চালিয়ে যে আয় হয়, তার চেয়ে খরচ বেশি হয়ে যায়। বিশেষ করে লোকাল ট্রেন থেকে প্রত্যাশিত আয় না পাওয়ার পেছনে টিকিট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বড় কারণ।

তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে প্রতিটি ট্রেনে নিয়মিত টিকিট পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনা করলে খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং আয় বাড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সব মেইল ও লোকাল ট্রেনের আয়-ব্যয়ের হিসাব একসঙ্গে তৈরি করা হয়। প্রতিটি ট্রেন আলাদাভাবে বছরে কতটা লোকসান করছে, তার পৃথক হিসাব সবসময় রাখা হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থায় শুধু লাভ-লোকসানের হিসাব নয়, জনসেবার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অনেক মানুষ কম খরচে যাতায়াতের জন্য মেইল ও লোকাল ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল। তাই ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীদের স্বার্থ, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, বেসরকারি অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ে, সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত হয় এবং রাজস্ব অপচয় বন্ধ করা যায়, তাহলে রেল খাত উপকৃত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে সাধারণ যাত্রীরা সমস্যায় পড়তে পারেন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এখন সদর দপ্তরের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে ইজারা প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই উদ্যোগ পশ্চিমাঞ্চল রেলের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাবে নাকি যাত্রীদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত