প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে এবার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আসছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে তার এ সফর অনুষ্ঠিত হবে এবং সফরকালে উভয় দেশের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে।
পাকিস্তানের সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। ১৯৭১ সালের বিভাজনের পর থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নানা সময়ে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরস্পরের প্রতি সংযত অবস্থান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে কিছুটা সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষিতে ইসহাক দারের ঢাকা সফর ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের বর্তমান সরকার আঞ্চলিক কূটনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের কৌশলের অংশ হিসেবে এই সফরকে ব্যবহার করতে চায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত-মধ্য এশিয়া ট্রানজিট ও চীন-পাকিস্তান ইকনোমিক করিডোর (CPEC) প্রসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপের পথে হেঁটেছে ইসলামাবাদ। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযোগের ক্ষেত্রে কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তান এখন ঢাকা-ভিত্তিক সংলাপে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
এ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য যে চুক্তিগুলো স্বাক্ষর হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে—বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা, কৃষি ও টেক্সটাইল খাতে যৌথ উদ্যোগ, এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়। এছাড়াও, একটি ‘ভিসা সহজীকরণ চুক্তি’ এবং ‘উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কাঠামো’ প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সফরসূচি ঘোষণা না করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। একাধিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইসহাক দারের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এই সফরের মাধ্যমে অতীতের তিক্ততা পেরিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকে এগোনোর একটি কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছে ঢাকা ও ইসলামাবাদের পর্যবেক্ষক মহল। বিশেষত, জাতিসংঘ, ওআইসি ও সার্কের মতো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারস্পরিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে দুই দেশই এখন আরও সমন্বিত অবস্থান নিতে আগ্রহী। এদিকে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বিনিয়োগ পুনরায় সক্রিয় করার ক্ষেত্রেও আলোচনা হতে পারে বলে আভাস মিলেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফর যতটা না রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক রূপকথা, তার চেয়ে বেশি বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। অতীতের অনমনীয় অবস্থান, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে যে অদৃশ্য দূরত্ব রয়েছে, তা কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা সফরের মাধ্যমে রাতারাতি দূর হবে না। তবুও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ—এতে সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে ঢাকা সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও কিছু আলোচনা শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের স্মৃতি এখনও বাংলাদেশের গণচেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত; ফলে পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির আগমন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কতটা সমর্থন পাবে, তাও নজর রাখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য ইসহাক দারের ঢাকা সফর শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিবেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখা যাক, কথার পর বাস্তব কতদূর গড়ায়—এবং ভবিষ্যতের এই সম্ভাব্য সম্পর্ক পুনর্গঠন কতটা ফলপ্রসূ হয়।