সিলেটে টানা বৃষ্টিতে আবারও জলাবদ্ধতার শঙ্কা, উপশহরসহ নিম্নাঞ্চল ঝুঁকিতে, করপোরেশনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০২৫
  • ৬৫ বার

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সিলেট নগরীতে গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে জলাবদ্ধতার পুরনো আতঙ্ক। বিশেষ করে উপশহর, শেখঘাট, তালতলা, আম্বরখানা, মদিনা মার্কেট, টিলাগড়, শাহী ঈদগাহ, লালদিঘী এবং কুমারপাড়ার মতো এলাকার বাসিন্দারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ-পূর্ব মৌসুমী বায়ুর সক্রিয় অবস্থানের কারণে আগামী কয়েকদিন সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে করে সিটি করপোরেশন এলাকা জুড়ে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) কি আদৌ আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে? গত জুন-জুলাইয়ে অতিবৃষ্টির ফলে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। জরুরি চিকিৎসাসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বহু ঘরবাড়ি, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ার কারণে কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হয় নগরবাসীকে।

এই প্রেক্ষাপটে নগরবাসীর অভিযোগ, বর্ষা শুরুর আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর নর্দমা সংস্কার, জলাবাহিত পথ পরিষ্কারকরণ এবং পাম্পিং সিস্টেম উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার খুব সামান্যই বাস্তবায়ন করেছে সিটি করপোরেশন। সিসিকের সাম্প্রতিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অনেক খাল-নালা এখনো কচুরিপানা ও আবর্জনায় ভরপুর, ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কোথাও কোথাও পানি নিষ্কাশনের সুস্পষ্ট পথ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুব হাসান, যিনি উপশহরের বাসিন্দা, বলেন, “বৃষ্টি হলেই উপশহরের রাস্তাগুলো নদীতে পরিণত হয়। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা প্রায় প্রতি বর্ষায় একটাই প্রশ্ন করি—এই শহরে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বৃষ্টির পানি কোথায় যাবে, সেটাই কি সিসিক জানে না?”

সিসিকের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, “এইবার আমরা আগের চেয়ে প্রস্তুত। ড্রেনেজ ব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইতোমধ্যেই পরিস্কার করা হয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পাম্প স্থাপন করা হয়েছে।” তবে এই প্রস্তুতির যথার্থতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, “কেবল খাল পরিষ্কার করলেই চলবে না, শহরের ছড়িয়ে থাকা অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত জলাশয় ভরাট, এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অসম্ভব।”

সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির নগরায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. হুমায়ুন কবির মনে করেন, “শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পানি নির্গমনকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে আলাদা করে মিনি-ড্রেনেজ মডেল চালু করা দরকার, যাতে বৃষ্টির পানি মুহূর্তে নিষ্কাশন সম্ভব হয়। এখন পর্যন্ত আমরা দেখেছি—বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে নগর প্রশাসনও ভেসে যায়।”

নগরবাসীর অনেকেই দাবি করছেন, শুধুমাত্র জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় করপোরেশন কর্তৃক আলাদা বাজেট বরাদ্দ, বৃষ্টির আগেই ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক যাচাই এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। অনেকে বলছেন, আগে যে এলাকায় আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানি জমত না, এখন সেখানে কয়েক ঘণ্টা জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

সিসিকের পক্ষ থেকে যদিও সাময়িক প্রস্তুতির দাবি করা হয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে যেসব সংকেত পাওয়া যাচ্ছে তা আশঙ্কাজনক। সিসিকের কয়েকটি মজুদ পাম্প অকেজো অবস্থায় রয়েছে এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নালাগুলো এখনও আগের মতো বন্ধ ও সাফ না হওয়ায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়।

সবশেষে বলা যায়, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা থাকলে সিলেট শহরের জন্য সামনের কয়েকদিন অত্যন্ত সংকটময় হয়ে উঠতে পারে। সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর ছিল—তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নগরবাসী এখনও আস্থা রাখতে পারছে না—নগরের গলিতে নামলেই যে পা ডুববে না, তার নিশ্চয়তা আজও মিলছে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত