প্রকাশ: ০৯ অগাস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার মধ্যে এক নাটকীয় মোড় নিতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক কূটনীতি। আগামী ১৫ আগস্ট আলাস্কায় মুখোমুখি বসতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই বহুল প্রত্যাশিত বৈঠক নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও উদ্বেগ দুই-ই তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প নিজেই সামাজিক মাধ্যমে বৈঠকের ঘোষণা দেন এবং পরে ক্রেমলিনও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি, সিবিএস নিউজ এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ বিভিন্ন সূত্র এই বৈঠকের গুরুত্ব ও সম্ভাব্য এজেন্ডা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বৈঠকের ঘোষণার আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউক্রেনের কিছু অঞ্চল রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, সাড়ে তিন বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং উভয় পক্ষের জন্যই একটি ‘অঞ্চল বিনিময়ের’ সমাধান হতে পারে সর্বোত্তম পথ। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেননি কোন কোন অঞ্চল নিয়ে আলোচনা হবে, তবুও তার বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এক ধরনের সমঝোতার চেষ্টা চলছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এমন একটি চুক্তির জন্য ইউরোপীয় নেতাদের রাজি করানোর চেষ্টা করছে যেখানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকবে দনবাস অঞ্চলের সম্পূর্ণ অংশ এবং ক্রাইমিয়া। অপরদিকে খেরসন ও ঝাপরোজ্জিয়া অঞ্চল থেকে রাশিয়া সরে দাঁড়াবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি, পুতিন সম্প্রতি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের সাথে মস্কোতে সাক্ষাৎ করে অনুরূপ প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এরকম কোনো আঞ্চলিক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব আগে থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণে আছে। ইউক্রেন গত আড়াই বছরে একাধিক পাল্টা আক্রমণ চালালেও রাশিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছু হটাতে পারেনি। ২০২২ সালের পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর ইস্তান্বুলে তিন দফা সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা ব্যর্থ হয়। মস্কোর শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী সীমিত করা, ন্যাটোতে যোগদানের পরিকল্পনা বাতিল করা এবং পশ্চিমাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। কিয়েভ ও তার মিত্ররা এই শর্তগুলোকে কার্যত আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইউরোপীয় নেতারা শান্তি চান, পুতিনও শান্তি চান এবং তিনি বিশ্বাস করেন জেলেনস্কিও একটি সমঝোতার পথে হাঁটতে প্রস্তুত। তবে জেলেনস্কিকে এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে হবে যা তার জনগণ ও সেনাবাহিনী মেনে নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরও জানান, ত্রিপক্ষীয় শান্তি চুক্তির সুযোগ এখনো আছে এবং প্রয়োজনে জেলেনস্কিকেও বৈঠকে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
এটি হবে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর প্রথম সরাসরি বৈঠক। এর আগে ২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পুতিনের সাথে বৈঠক করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে টেলিফোনে সংক্ষিপ্ত আলাপ হলেও গত মাস পর্যন্ত তিনি ক্রেমলিনের প্রতি অপেক্ষাকৃত কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হলে রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছিলেন।
১৫ আগস্টের বৈঠককে ঘিরে এখন কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। সমঝোতা হলে এটি হতে পারে ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘোরানো একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তবে ব্যর্থ হলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে—যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে।