উচ্চকক্ষ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদে উঠে এলো আপত্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
উচ্চকক্ষ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদে উঠে এলো আপত্তি

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন কতটা প্রয়োজনীয় এবং একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ কত বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন—সংবিধান সংশোধন নিয়ে চলমান আলোচনায় নতুন করে এই দুই বিষয় সামনে এসেছে। জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মী ও টক শো আলোচকদের মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার সময়সীমা সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তির কথা উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এসব মতামত উঠে আসে। সভা শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের আলোচনার বিভিন্ন দিক জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেশ হওয়ায় এখানে দুই কক্ষের সংসদ আদৌ প্রয়োজন কি না, এমন প্রশ্ন বৈঠকে এসেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হওয়ায় বিশেষ কমিটি বর্তমানে সেই কাঠামোকে সামনে রেখেই কাজ করছে।

জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী জাতীয় সংসদকে দুই কক্ষবিশিষ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে একটি নিম্নকক্ষ এবং অন্যটি উচ্চকক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে। সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনায় উচ্চকক্ষের কাঠামো, ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন মত রয়েছে। সাম্প্রতিক মতবিনিময় সভায় কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বর্তমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থাই যেখানে পুরোপুরি কার্যকর হয়ে ওঠেনি, সেখানে নতুন করে উচ্চকক্ষ গঠন করলে এর বাস্তব কার্যকারিতা কতটা হবে।

বৈঠকে উচ্চকক্ষ গঠনের সম্ভাব্য আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ মনে করেন, দ্বিতীয় একটি কক্ষ গঠনের ফলে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন কাঠামো সংসদীয় কার্যক্রমে কী ধরনের বাস্তব পরিবর্তন আনবে, সেটিও আগে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মত দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষ কমিটির সভাপতি জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে এবং সরকার সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এগোতে চায়। মতবিনিময় সভায় যে প্রশ্ন বা বিকল্প প্রস্তাব এসেছে, তা রাজনৈতিক দল ও সংসদে আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও তিনি জানান। অর্থাৎ উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন মত উঠে এলেও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে যায়নি।

একই মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী পদে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার প্রস্তাব নিয়েও ভিন্নমত উঠে আসে। জুলাই জাতীয় সনদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি যতবার বা যত মেয়াদেই প্রধানমন্ত্রী হন, জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ ১০ বছর ওই পদে থাকতে পারবেন। সনদের আলোচনার সময় বিএনপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল বলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে মঙ্গলবারের মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন এই সীমা নির্ধারণের বিরোধিতা করেন। তাঁদের বক্তব্যের সারকথা হলো, একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনের মাধ্যমে বারবার জনগণের সমর্থন পান এবং দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান, তাহলে তাঁর প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় সংবিধানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে দেওয়া গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সভায় কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সীমা নির্ধারণকে অগণতান্ত্রিক বলে মত দিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবটি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে এসেছিল। ব্যক্তিকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি ঠেকানোর চিন্তা থেকেই প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি এখনো ওই অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়াদসীমা নিয়ে বিতর্কটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। একদিকে দীর্ঘ সময় একই ব্যক্তির হাতে সরকার পরিচালনার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, অন্যদিকে নির্বাচনে জনগণের মতামত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের অধিকার কতটা সীমাবদ্ধ করা উচিত, সে প্রশ্নও রয়েছে। মঙ্গলবারের মতবিনিময়ে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা গেছে।

এদিকে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো নিয়েও মতামত এসেছে। বিশেষ কমিটির সভাপতি জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে, কারা এতে থাকবেন এবং এর কাঠামো কী হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জুলাই জাতীয় সনদের কিছু প্রস্তাবের সঙ্গে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে যুক্ত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ কমিটির সভাপতি জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত রয়েছে, সেসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বিরোধী দল সংসদে কোনো বিকল্প প্রস্তাব দিলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেই কাঠামো অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করতে চায় বলেও জানান তিনি।

সংবিধান সংশোধন নিয়ে এই মতবিনিময় প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি টক শো আলোচক, সম্পাদক ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁদের আলোচনায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, সংসদের কার্যকারিতা, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।

বিশেষ কমিটি এর আগে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছে। সামনে নারী নেতৃত্ব, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, বিচারক, আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও আহতদের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার কথাও কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সব পক্ষের মতামত সংগ্রহের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে এবং তার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি।

ফলে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা, প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সীমা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো এবং নির্বাহী ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য—সব মিলিয়ে সংবিধান সংশোধনের চলমান প্রক্রিয়ায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। মতবিনিময় সভায় উঠে আসা মতামতগুলো এখন বিশেষ কমিটির পরবর্তী আলোচনা ও সুপারিশ তৈরির প্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত