ফ্রান্সে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে আটক ৪৪০

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
ফ্রান্সে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে আটক ৪৪০

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফ্রান্সজুড়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ মঙ্গলবার আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ, সড়কে প্রতিবাদ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। আটক ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে জানা গেছে। একই দিনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন ইউনিয়নের ডাকা ধর্মঘটও পালিত হয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী প্যারিসের আশপাশে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষে জায়গার সংকট, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষকদের ওপর বাড়তে থাকা কাজের চাপসহ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছে। অনেক স্কুলের প্রবেশপথে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাস কার্যক্রম ব্যাহত করেছে এবং নিজেদের দাবির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে।

মঙ্গলবারের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি কয়েকটি এলাকায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১০ জন শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ৪৮ সদস্যও আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের কারণে অন্তত ৪০০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধার মুখে পড়েছে।

বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া ছবি ও ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের ময়লার পাত্রে আগুন দিতে দেখা গেছে। কিছু এলাকায় বাসস্টপও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করলে পুলিশ লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএমটিভিকে বলেন, মঙ্গলবারের কর্মসূচি থেকে ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি জানান, আটকসংখ্যা চূড়ান্ত নয় এবং তাদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভের বিভিন্ন ঘটনায় কারা কী ধরনের ভূমিকা রেখেছে, তা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিয়ন সিন্ডিকাল লিসেয়েনের সভাপতি রিয়াদ রানি পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারের দমনমূলক আচরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। কয়েকজন ফরাসি রাজনীতিক পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবস্থাপনাকে সমর্থন করেছেন।

ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের অধিকার স্বীকার করলেও সহিংসতার ঘটনায় কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, বিক্ষোভ করার অধিকার একটি মৌলিক স্বাধীনতা। তবে এই অধিকারকে সহিংস কর্মকাণ্ড, স্কুল অবরোধ বাড়ানো কিংবা শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

সরকারের এই অবস্থানের বিপরীতে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য হলো, তারা কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে রাস্তায় নামেনি; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তারা প্রতিবাদ করছে। ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে জানায়, তাদের শ্রেণিতে ৩৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং শিক্ষকদের ওপরও প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের এই বক্তব্য আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর একটি দিক তুলে ধরে। ফ্রান্সের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীসংখ্যা বাড়লেও শিক্ষা অবকাঠামো ও মানবসম্পদের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রাখা হচ্ছে না। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর চাপ বাড়ছে এবং শিক্ষকদের কাজের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আন্দোলনের শুরু হয় গত সপ্তাহে প্যারিসের আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে। সেখান থেকে তা ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে তাদের প্রতিবাদ জানাতে থাকে। মঙ্গলবারের ঘটনাগুলোতে আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

এর এক দিন আগে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশে আতশবাজি, আগুন ও সহিংসতার মতো ঘটনা কোনোভাবেই শিক্ষার্থী, স্কুলকর্মী বা পুলিশ কর্মকর্তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে না। এর আগে বিক্ষোভের ঘটনায় ১৬৪ জনকে আটক করা হয়েছিল।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি মঙ্গলবার দেশজুড়ে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকা ধর্মঘটও পালিত হয়। শিক্ষক, হাসপাতালের কর্মী এবং সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়নগুলো কম বেতন, কর্মপরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এই কর্মসূচি পালন করে। ফলে শিক্ষার্থী বিক্ষোভের সঙ্গে একই দিনে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও জনসেবামূলক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নগুলোর ডাকা ধর্মঘটে প্রায় দুই লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় ধর্মঘট ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই পালিত হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই একদিকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবির বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে বিক্ষোভের সময় সহিংসতা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যেখানে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার সমাধান চাচ্ছে, সেখানে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী স্কুল অবরোধ, অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতার ঘটনাকে আলাদা করে দেখছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে এখন একই সঙ্গে দুটি বিষয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে—শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত শিক্ষা-সংক্রান্ত অভিযোগ ও দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং বিক্ষোভের নামে সহিংসতা বা জননিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা। আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে কি না এবং সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তা এখন ফ্রান্সের শিক্ষা ও সামাজিক পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত