স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে গণসংযোগে জামায়াত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে গণসংযোগে জামায়াত

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে রেখে সেপ্টেম্বরজুড়ে দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি চালিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের পক্ষ থেকে এটিকে নিয়মিত দাওয়াতি কার্যক্রমের অংশ বলা হলেও কর্মসূচির বিভিন্ন পর্যায়ে স্থানীয় নির্বাচন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আন্দোলনের বিষয়গুলোও সামনে এসেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়, লিফলেট বিতরণ, পথসভা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য ছিল দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা। একই সঙ্গে সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানো এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার কাজও হয়েছে। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত নির্বাচন কমিশনের কাছেও বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেই রাজধানীতে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করে দলটি। ঢাকার বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মীরা বুথ স্থাপন, লিফলেট বিতরণ এবং এলাকাভিত্তিক গণসংযোগ চালান। দলের নেতারা বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন কর্মস্থলে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। কোথাও কোথাও পথসভা ও ছোট পরিসরের মতবিনিময় সভার আয়োজনও করা হয়।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের বক্তব্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিটি দলের নিয়মিত বার্ষিক পরিকল্পনার অংশ। তিনি জানিয়েছেন, এর আগে আগস্টে দলের নারী শাখার পক্ষ থেকেও গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে সংগঠন ও চলমান রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি আগ্রহীদের মধ্যে দলের পরিচিতি ও বিভিন্ন বই বিতরণ করা হয়েছে।

দলটির নেতারা কর্মসূচিকে সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শ তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের বিভিন্ন মতামত শোনা হয়েছে। তবে গণসংযোগে অংশগ্রহণ বা বিভিন্ন কর্মসূচিতে মানুষের উপস্থিতিকে রাজনৈতিক সমর্থনের সরাসরি পরিমাপক হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ এ ধরনের কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের পরিসর ও দলীয়ভাবে প্রকাশিত তথ্যের বাইরে সামগ্রিক জনমতের নিরপেক্ষ পরিমাপ আলাদাভাবে প্রয়োজন।

গণসংযোগের সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলটির অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের এলাকায় যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দলীয় পরিচিতি ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। ঢাকার মহানগর পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেও নির্বাচনী প্রস্তুতির বিষয়টি উঠে এসেছে। এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত নয় দফা দাবি উত্থাপন করেছিল। দলটি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দেয়।

গণসংযোগ কর্মসূচির সঙ্গে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রচারও যুক্ত ছিল। বিশেষ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ জোটের ঘোষিত দাবিগুলো নিয়ে লিফলেট বিতরণ ও জনমত তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর মাসে জোটটি বিভিন্ন বিভাগীয় শহর অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচিও পালন করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর ঢাকা-রংপুরসহ আরও কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিল জোটটি।

জোটের এসব কর্মসূচিতে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও জনস্বার্থের বিষয়ও সামনে আনা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবির সংখ্যা ও বিষয়বস্তুতে কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। কোথাও ছয় দফা, কোথাও সাত বা আট দফা দাবির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই গণহত্যার বিচার, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি-সংক্রান্ত বিষয়সহ বিভিন্ন দাবি আলোচনায় এসেছে।

জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সেপ্টেম্বরের গণসংযোগ কর্মসূচি উপলক্ষে দেশবাসীর প্রতি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে ন্যায়বিচার, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান, ভোটাধিকার, মৌলিক অধিকার এবং বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ও দলীয় বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পাশাপাশি দলের সাহিত্য ও প্রচারসামগ্রী বিতরণ করেছেন। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

গণসংযোগের আরেকটি দিক ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকে মানুষের জামায়াতে যোগ দেওয়ার দাবি। দলটির পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন সদস্য ও সমর্থক যুক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে এ ধরনের যোগদানের সংখ্যা বা এর মাধ্যমে সামগ্রিক জনসমর্থনে কী পরিবর্তন এসেছে, সে বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিমাপ প্রকাশিত হয়নি। ফলে দলীয় কর্মসূচির সাফল্য মূল্যায়নে দলটির নিজস্ব বক্তব্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী ফলাফলও বিবেচনায় আসবে।

জামায়াতের নেতারা বলছেন, গণসংযোগ শেষ হওয়ার পর তৃণমূলের বিভিন্ন ইউনিট থেকে কর্মসূচির বিস্তারিত প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হবে। কোথায় কত ধরনের কর্মসূচি হয়েছে, মানুষের সঙ্গে কী ধরনের মতবিনিময় হয়েছে এবং সাংগঠনিকভাবে কী ধরনের সাড়া পাওয়া গেছে—এসব তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। এই পর্যালোচনার মাধ্যমে পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি নির্ধারণে দলটি অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।

সেপ্টেম্বরের এই কর্মসূচি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা বাড়ছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলগুলোর বৈঠক, স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই এবং মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। জামায়াতও এর বাইরে নয়; বরং তাদের সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে সাংগঠনিক প্রচার ও নির্বাচনী প্রস্তুতি পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে ১১ দলীয় জোটের আন্দোলন অব্যাহত থাকায় দলটির গণসংযোগ কর্মসূচি শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জোটের রাজনৈতিক দাবিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার কাজও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। জোটের নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির কথা বলেছেন।

সেপ্টেম্বরের গণসংযোগ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর জামায়াত এখন তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণের দিকে যাচ্ছে। একই সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। ফলে সামনে দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা কীভাবে এগোয় এবং স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা কী ধরনের প্রস্তুতি নেন, তা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরজুড়ে জামায়াতের গণসংযোগে ধর্মীয় ও সাংগঠনিক দাওয়াতের পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচন এবং চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। দলটির নেতারা এটিকে জনসম্পৃক্ততা ও সাংগঠনিক বিস্তারের কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন। তবে এই কর্মসূচির মাধ্যমে বৃহত্তর জনমতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা নির্ধারণ করতে দলীয় দাবির বাইরে আরও বিস্তৃত ও স্বাধীন জনমত-তথ্য প্রয়োজন হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত