গাজা যুদ্ধবিরতি ও গাজা সিটি নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা: নেতানিয়াহুর ‘নিজস্ব শর্তে’ আলোচনার ইঙ্গিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, গাজা যুদ্ধ ‘নিজেদের শর্তে’ বন্ধ ও অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে হামাসের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গাজা সিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যে বড় ধরনের স্থলআক্রমণের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে তার মন্ত্রিসভা। কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে হামাস সম্মতি দিলেও ইসরাইল তা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিশেষ করে বিবিসি, জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে ইসরাইলের গাজা বিভাগের সদর দপ্তর পরিদর্শনকালে এক ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের সব জিম্মির মুক্তির জন্য অবিলম্বে আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমি গাজা সিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং হামাসকে পরাজিত করার জন্য ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিকল্পনা অনুমোদন করেছি।” তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামাসকে পরাজিত করা এবং সব জিম্মির মুক্তি—এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অগ্রসর হবে। পরবর্তী ধাপের আলোচনা কীভাবে এগোবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

গত কয়েক সপ্তাহে ইসরাইলি সাঁজোয়া ইউনিটগুলোর গাজা সিটির উপকণ্ঠে অগ্রসর হওয়া এবং পুনরায় অবস্থান নেওয়ার খবরে শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। গাজার কিছু অঞ্চলে রাতদিনের গোলাবর্ষণ ও ড্রোন-তৎপরতার কারণে চিকিৎসাসেবা, খাদ্য ও পানির চেইনবারবার ভেঙে পড়ছে—যা স্থানীয় মানবিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যেসব হাসপাতাল আংশিক কার্যকর, সেগুলোতে শয্যার তুলনায় আহতের সংখ্যা বহু গুণ বেশি; অপারেশন থিয়েটারে বিদ্যুৎ ও অক্সিজেনের ঘাটতি নিয়মিত।

কাতার ও মিশরের দীর্ঘদিনের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক যে প্রস্তাব সামনে আসে, তাতে প্রায় দুই মাসের যুদ্ধবিরতি, বন্দি ও জিম্মি বিনিময়, এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে মানবিক প্রবেশাধিকার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে। হামাস ওই কাঠামোয় নীতিগত সম্মতি জানিয়েছে বলেই প্রকাশিত হয়েছে। তবে ইসরাইলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি কেবল তখনই সম্ভব, যখন জিম্মিদের পূর্ণ মুক্তি নিশ্চিত হবে এবং হামাসের সামরিক ক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়বে। ফলে দুই পক্ষের শর্তগত ব্যবধান এখনও প্রশস্ত—এবং সেটিই আলোচনাকে জটিল রাখছে।

নেতানিয়াহুর সভাপতিত্বে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা সম্প্রতি গাজা সিটি দখলের বিস্তৃত পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে। তবে দেশটির ঘনিষ্ঠ কয়েকটি মিত্র রাষ্ট্র প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে এ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রতিবেদন উল্লেখ করছে। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় বৃহৎ আকারের সামরিক অভিযান মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে এবং আলোচনার সম্ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে।

৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামলার পর বিভিন্ন পর্যায়ে জিম্মি-বিনিময় আংশিকভাবে ঘটলেও বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ বা আটক বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসরাইলি নেতৃত্ব বলছে, সামরিক চাপ এবং লক্ষ্যভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রেখেই জিম্মিদের মুক্তির জন্য আলোচনায় যেতে হবে। অন্যদিকে, হামাসের পক্ষপাতী মহল বলছে, পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো অর্থবহ বন্দি-বিনিময় সম্ভব নয়। এই টানাপোড়েনের মাঝেই মধ্যস্থতাকারীরা একটি ‘ধাপে ধাপে’ কাঠামোর কথা ভাবছেন—যেখানে প্রথম ধাপে আংশিক যুদ্ধবিরতি ও বয়স্ক/অসুস্থ জিম্মিদের মুক্তি, পরের ধাপে বিস্তৃত মানবিক সহায়তা এবং সর্বশেষে রাজনৈতিক-নিরাপত্তা প্রশ্নে সমঝোতার রূপরেখা থাকবে।

গাজায় সংঘাত শুরুর পর থেকে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বেসামরিক প্রাণহানি লাগাতার বাড়তে থেকেছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যসূত্র উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় অন্তত ৬২ হাজার ১৯২ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হলেও সংঘাতের তীব্রতা ও ঘনত্ব বিবেচনায় মানবিক মাশুল যে ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে, তা নতুন করে প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।

ইসরাইলি মন্ত্রিসভার পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেলে গাজা সিটি আরও দীর্ঘ ও তীব্র সামরিক চাপে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে প্রতিবেশী এলাকাতেও। কিন্তু একই সঙ্গে জিম্মি-ইস্যুকে সামনে রেখে ‘নিজস্ব শর্তে’ আলোচনা শুরুর বার্তা রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষীণ সম্ভাবনাকেও পুরোপুরি নিঃশেষ করে না। মধ্যস্থতাকারীরা যদি উভয় পক্ষকে একটি ‘ন্যূনতম অভিন্ন মঞ্চে’ আনতে পারেন, তাহলে যুদ্ধবিরতি—হোক তা পর্যায়ক্রমিক বা সীমিত—মানবিক তৎপরতার জন্য সময় ও পরিসর তৈরি করতে পারে।

দুই পক্ষের ঘোষিত লক্ষ্য ও শর্তের মধ্যে মূল ফাঁকটি হলো নিরাপত্তা বনাম শাসনক্ষমতার প্রশ্ন। ইসরাইল বলছে, হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস না করা পর্যন্ত স্থিতিশীলতা আসবে না। বিপরীতে, হামাস বা তাদের মিত্রগোষ্ঠী মনে করে, রাজনৈতিক সমীকরণে ‘পূর্ণ যুদ্ধবিরতি’ ছাড়া কোনো স্থায়ী রূপরেখা গড়ে উঠবে না। এই অবস্থানে মধ্যপন্থা খুঁজে পাওয়া কঠিন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ-সংঘাত আলোচনা প্রক্রিয়াকে জটিল রাখে।

নেতানিয়াহুর ‘নিজস্ব শর্তে’ আলোচনায় যাওয়ার ঘোষণা, মন্ত্রিসভার সামরিক পরিকল্পনার অনুমোদন, হামাসের ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে নীতিগত সম্মতি এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের অব্যাহত প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে গাজা পরিস্থিতি একসঙ্গে দুই বিপরীতমুখী স্রোত দেখাচ্ছে: একদিকে যুদ্ধের সম্ভাব্য নতুন ধাপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক সমাধানের সূক্ষ্ম সম্ভাবনা। শেষ পর্যন্ত কোন স্রোত শক্তিশালী হয়, তা নির্ধারণ করবে ময়দানের বাস্তবতা, কূটনৈতিক টেবিলের অঙ্ক এবং মানবিক চাপের যৌথ গতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত