প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে তেহরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হলে ইরান “সমপর্যায়ের ও যথাযথ” পদক্ষেপ নেবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতে এক টেলিফোন আলাপে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। ইরানি বার্তা সংস্থা মেহের জানিয়েছে, আলোচনায় আরাগচি স্পষ্ট করেছেন, ইউরোপের তিন দেশের সম্ভাব্য ‘স্ন্যাপব্যাক’ উদ্যোগ ইরানের প্রতি তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত করবে এবং এমন কোনো পদক্ষেপ ইরানের জাতীয় অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষার প্রশ্নে দৃঢ় প্রতিক্রিয়ায় পড়বে।
ফোনালাপে আরাগচি বলেন, ইরান মনে করে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোগটি বেআইনি ও অযৌক্তিক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার জাতীয় অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় তিনটি ইউরোপীয় দেশের এই বেআইনি ও অযৌক্তিক পদক্ষেপের যথাযথ জবাব দেবে।” একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, অন্য পক্ষগুলো সদিচ্ছা প্রদর্শন করলে তেহরান ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনায় ফিরে যেতে প্রস্তুত।
ইউরোপের এই তিন দেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, ৩০ দিনের মধ্যে যদি পরিষদ তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার প্রস্তাব অনুমোদন না করে, তবে তারা ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করবে। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত যৌথ সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) ও নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় ‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থা এমন এক আইনি প্রক্রিয়া, যার আওতায় কোনো পক্ষের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগে পূর্বের নিষেধাজ্ঞাগুলো দ্রুতগতিতে পুনরায় কার্যকর করা যায়। তবে ইরানের দাবি, বর্তমান বাস্তবতায় ইউরোপীয় তিন দেশের সে ক্ষমতা আর বহাল নেই এবং এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিধিবিধানকে পাশ কাটিয়ে নেওয়ার শামিল।
তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইউরোপীয়দের পদক্ষেপকে ‘বেআইনি’ উল্লেখ করে বলেছে, এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা—আইএইএ’র সঙ্গে চলমান সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ইরান আরও বলেছে, রাজনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি কোনোভাবেই পরিদর্শন, যাচাই ও আস্থা পুনর্গঠনের কাঠামোকে শক্ত করবে না; বরং তা সংলাপের পরিসর সঙ্কুচিত করবে। একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি বিষয়ক প্রধানের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি স্পষ্ট করে জানান, নিষেধাজ্ঞা পুনরায় সক্রিয় করার প্রশ্নে এই তিন দেশের কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। রাশিয়া ও চীন এ প্রসঙ্গে ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করেছে বলে তেহরান জানিয়েছে।
পরিস্থিতি দ্রুত জটিলতার দিকে যেতে পারে—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বার্তা। নিরাপত্তা পরিষদে ৩০ দিনের সময়সীমা কার্যকর হলে, সেই উইন্ডোর মধ্যে ভেটো রাজনীতি, প্রস্তাব উত্থাপন ও আইনি ব্যাখ্যা–পাল্টা ব্যাখ্যার অচলাবস্থাই প্রধান চিত্র হতে পারে। এমন এক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজারের স্থিতি এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তেহরান ও ইউরোপের টানাপোড়েন বাড়লে পারস্য উপসাগরীয় উত্তেজনাও বাড়তে পারে, যা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও মূল্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ‘সমপর্যায়ের প্রতিক্রিয়া’ বলতে নীতিগত ও বাস্তবিক উভয় ক্ষেত্রেই পাল্টা পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে—যার মধ্যে থাকতে পারে সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ, আইএইএ’র অতিরিক্ত প্রবেশাধিকার সীমিত করা, কিংবা আঞ্চলিক কূটনৈতিক অঙ্গনে জোট–সমীকরণে নতুন চাপ সৃষ্টি। তবে একই সঙ্গে আরাগচির ‘ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ’ আলোচনায় ফেরার প্রস্তাবটি ইঙ্গিত করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সংলাপের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এই মুহূর্তে সব পক্ষের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে আইনি কাঠামো, টেকনিক্যাল যাচাই ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির এক বাস্তবসম্মত সমন্বয়। ইরান বলছে, তাদের ওপর একতরফা চাপ সৃষ্টি করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো স্থিতিশীল সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। ইউরোপীয় পক্ষগুলোর বক্তব্য, তেহরানকে চুক্তির মৌলিক শর্তে ফিরতে হবে এবং আণবিক কর্মসূচি নিশ্চিতভাবে শান্তিপূর্ণ রাখার বিষয়ে দৃঢ় নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই দ্বিমত–পার্থক্যের মাঝেই আগামী দিনগুলোতে নিরাপত্তা পরিষদের কূটনীতিতে গতি আসবে কি না, সে দিকেই তাকিয়ে আন্তর্জাতিক মহল।
পরিস্থিতির চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ভর করবে ৩০ দিনের প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর। যদি নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে; আর যদি সদিচ্ছার ভিত্তিতে ‘ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ’ সংলাপের সূচনা হয়, তাহলে সংকট নিবারণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। আপাতত তেহরানের বার্তাই সবচেয়ে স্পষ্ট—নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হলে জবাবও ‘সমপর্যায়েই’ আসবে।