বিশ্ববাজারে স্বর্ণের উল্টো স্রোত: টানা দ্বিতীয় সপ্তাহেও কমলো দাম, বিনিয়োগে অস্থিরতা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৭ জুন, ২০২৫
  • ২৯ বার
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের উল্টো স্রোত: টানা দ্বিতীয় সপ্তাহেও কমলো দাম, বিনিয়োগে অস্থিরতা

প্রকাশ: ২৭শে জুন’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্ববাজারে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত হয়ে আসা স্বর্ণের মূল্য হঠাৎ করেই ব্যতিক্রমী এক ধারা গ্রহণ করেছে। টানা দ্বিতীয় সপ্তাহেও স্বর্ণের বাজারে দেখা দিয়েছে ঊর্ধ্বগতি-বিরোধী এক প্রবণতা। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা খানিকটা প্রশমিত হওয়া, ডলারের তুলনামূল্য বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের অপেক্ষার কারণে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মনোভাব পরিবর্তন হয়েছে। এর প্রভাবে কমে গেছে স্বর্ণের প্রতি চাহিদা, যা পুরো বাজারে তৈরি করেছে নেতিবাচক প্রভাব। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি সাময়িক হলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শুক্রবার (২৭ জুন) আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী সকাল ২টা ৩৪ মিনিটে স্পট গোল্ডের মূল্য ০.৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় প্রতি আউন্স ৩,৩১৩.২৩ ডলারে। সাপ্তাহিক হিসাবে এই দরপতনের পরিমাণ প্রায় ১.৭ শতাংশ, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে ধারাবাহিক পতন। একই সময়ে মার্কিন ফিউচার মার্কেটেও স্বর্ণের দর নেমে আসে ৩,৩২৫.৭০ ডলারে, যা আগের তুলনায় ০.৭ শতাংশ কম।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধাক্কার অন্যতম কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত। ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্বের যে তীব্রতা একসময় বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, তার ধীরে ধীরে প্রশমন বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও প্রভাব ফেলেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডসিলভার সেন্ট্রালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রায়ান ল্যানের ভাষায়, ‘বাজার আপাতত কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বা পোর্টফোলিও থেকে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদে ঢালাওভাবে সরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না।’

এর পাশাপাশি, মার্কিন ডলারের মূল্যও সম্প্রতি ০.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ডলারনির্ভর অন্যান্য অর্থনীতির বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে এবং মূল্য পতনের এই চক্রকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

বিশ্ববাজার এখন তাকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের দিকে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় সূচক (Core PCE)। শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সময় এই তথ্য প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। রয়টার্সের করা পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সূচক মাসিক ভিত্তিতে ০.১ শতাংশ এবং বার্ষিক ভিত্তিতে ২.৬ শতাংশ বাড়তে পারে। এই তথ্যের ওপর নির্ভর করবে ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ সুদহার নীতির দিকনির্দেশনা।

মার্কেট অ্যানালিস্টরা বলছেন, বাজারে এখন এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ৬৩ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে। তবে এই বিষয়ে এখনো পরিষ্কার অবস্থান নেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেবলমাত্র দুইজন নীতিনির্ধারক প্রকাশ্যে জুলাইয়ের বৈঠকে সুদের হার কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছু বিনিয়োগকারী স্বর্ণের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকছেন। বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেইয়ার বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে প্ল্যাটিনাম ও প্যালেডিয়ামের মতো ধাতুতে সরে যাচ্ছেন। এর ফলে স্বর্ণের প্রতি ঐতিহ্যগত নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।’

সপ্তাহের শেষ দিকে মূল্যবান ধাতুর বাজারে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী প্রবণতা। স্পট সিলভারের মূল্য অপরিবর্তিত থেকে প্রতি আউন্সে ৩৬.৬৩ ডলারে স্থির থাকলেও, প্ল্যাটিনামের দর ১.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১,৩৯১.২৮ ডলারে এসে দাঁড়ায়—যা এখনো ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। বিপরীতে, প্যালেডিয়ামের দাম বাড়তে বাড়তে পৌঁছেছে ১,১৪৭.৭৮ ডলারে, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদিও সাম্প্রতিক মূল্য হ্রাস কিছু বিনিয়োগকারীর জন্য স্বর্ণ কেনার উপযুক্ত সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবুও মূলধারার বিনিয়োগে প্রবেশের আগে বাজারের গতি-প্রকৃতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

বিশ্ববাজারে মূল্যবান ধাতুর এই চলমান অস্থিরতা যে শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত