প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ও জমি দিয়ে নির্মিত ২৭০টি ফ্ল্যাট বিতরণ করা হয়েছিল বিশেষ সুবিধাভোগীদের মধ্যে। এই ফ্ল্যাটগুলোর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নামে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ওবায়দুল কাদের রাতের ভোটের কারিগর হিসেবে পরিচিত আমলা ও শিক্ষকসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামেই এসব বরাদ্দ অনুমোদন করেছিলেন বলে মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রে উঠে এসেছে। তালিকায় সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমানের নামও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেতু মন্ত্রণালয় ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে অনুষ্ঠিত ১২টি সভার কার্যবিবরণীতে এই বরাদ্দগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অনেক কর্মকর্তা একাধিকবার বিভিন্ন প্রকল্প থেকে জমি বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছিলেন, কিন্তু তা গোপন রেখে নতুন ফ্ল্যাট দখল করেন। প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কিংবা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে পূর্বে প্লট বা ফ্ল্যাট নেওয়া সত্ত্বেও মিথ্যা হলফনামার মাধ্যমে আবারও বরাদ্দ আদায় করেন।
নথি অনুসারে, ফ্ল্যাটগুলো পেয়েছেন সেতু বিভাগের ২৯ কর্মকর্তা, সেতু কর্তৃপক্ষের ১৫৮ কর্মচারী, পদ্মা সেতু প্রকল্পের ১২, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ২, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ১৩, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ১ জন, পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিভিন্ন কমিটির ১০ সদস্য, বোর্ড মেম্বার ২৭ জন এবং মন্ত্রীর দপ্তরের ১৩ কর্মচারী।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, এই ফ্ল্যাটগুলো নির্মিত হয়েছিল ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত ৯ হাজারের বেশি পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য। কিন্তু পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত আবাসনগুলোর বড় অংশ চলে গেছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে। ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার ২২০ পরিবারের আবেদন সত্ত্বেও মাত্র ৩০২ জনকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তাও তাদের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি। অবশিষ্ট ফ্ল্যাটগুলো পরে আমলা, শিক্ষক ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্তদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
২০১৮ সালে সেতু বিভাগের বোর্ড সভায় ‘সেতু কর্তৃপক্ষ আবাসন নির্মাণ প্রকল্প’ নামে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়, যেখানে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমি ব্যবহার করা হয় অন্য উদ্দেশ্যে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়া জমির ব্যবহার আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হলেও ওই বৈঠকে ওবায়দুল কাদেরসহ ১০ জন সচিব এই অনুমোদন দেন। ফলে আইন ভঙ্গের অভিযোগও ওঠে।
২০১৯ সালের ১৭ জুন প্রথম বরাদ্দ কমিটির সভায় ১৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ফ্ল্যাট দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, যিনি এর আগেও রাজউক ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে প্লট ও ফ্ল্যাট নিয়েছিলেন। একই সভায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকও ফ্ল্যাট পান, যাদের কেউ কেউ পূর্বেও জমি বরাদ্দ নিয়েছিলেন।
পরবর্তী সভাগুলোতেও সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব, প্রকৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নাম উঠে আসে বরাদ্দ তালিকায়। ভূমি, বিদ্যুৎ, রেলপথ, অর্থ, প্রতিরক্ষা ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ও কর্মরত সচিবরা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। শুধু সচিব নন, ওবায়দুল কাদেরের সাবেক পিএস থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রোগ্রামার, এমনকি কম্পিউটার অপারেটর পর্যন্ত বিশেষ কোটায় ফ্ল্যাট পেয়েছেন।
সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় না থাকা সত্ত্বেও ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন, পূর্ববর্তী প্লট ও ফ্ল্যাটের তথ্য গোপন করে। এই ঘটনাকে ‘গরিবের সম্পদ বড়লোকদের পেটে’ যাওয়ার উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পুনর্বাসনের নামে সরকারি জমি ও অর্থে গড়ে তোলা প্রকল্পের ফ্ল্যাটগুলো সুবিধাভোগীদের হাতে চলে যাওয়া শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের পর এই অবৈধ বরাদ্দের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
আপনি কি চান আমি এই প্রতিবেদনটি আরেকটু বিস্তৃত বিশ্লেষণাত্মক ধাঁচে লিখে দিই, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মানবিক দিকটি আরও গভীরভাবে তুলে ধরা হবে?