প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে ভোক্তা ঋণের বৃদ্ধি গত অর্থবছরের শেষ তিন মাসে (এপ্রিল থেকে জুন) আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ভোক্তা খাতে ঋণ বেড়েছে ২৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকার বেশি, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশেরও বেশি। তুলনামূলকভাবে, মার্চ প্রান্তিকে ভোক্তা ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১.৮১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে।
অর্থনীতিবিদ এবং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ ছিল, যা ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে একটি চাপের সূচক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটারসহ আধুনিক জীবনধারার পণ্যের ক্রয় এই সময়ে ঋণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় ঋণ গ্রহণের এই বৃদ্ধি নির্দেশ করছে যে, উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া হলেও ভোক্তাদের চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের বিশদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ভোক্তা খাতে ঋণ ছিল এক লাখ ৩৯ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা ৩.৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এক লাখ ৪৪ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ঋণ বৃদ্ধির হার ১.৮১ শতাংশ এবং ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় এক লাখ ৪৭ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকায়। সর্বশেষ এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ঋণের হার ১৭.০৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে তা এক লাখ ৭২ হাজার ৬২১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ভোক্তা ঋণ সাধারণত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিলাসী পণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিবাহ, ভ্রমণ, জমি বা বাড়ি-গাড়ি ক্রয় এবং বড় আয়োজন। এছাড়া ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণও ভোক্তা ঋণের অন্তর্ভুক্ত। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন প্রকারের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে জনগণের চাহিদা মেটাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, চিকিৎসা, বিয়ে, ভ্রমণ, পেশাগত ঋণ, পরিবহন ঋণ, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও আমানতের বিপরীতে দেওয়া ঋণ।
গত প্রান্তিকে ভোক্তা ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ গিয়েছে টেলিভিশন, ফ্রিজ ও কম্পিউটার ক্রয়ে। এই তিনটি ক্ষেত্রে মোট ঋণ গ্রহণ হয়েছে ৯ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এছাড়া ফ্ল্যাট ক্রয়ে ৮৮৪ কোটি, পরিবহন ঋণে এক হাজার ৮২৫ কোটি, ক্রেডিট কার্ডে ৫৮৪ কোটি, শিক্ষাঋণে এক হাজার ১২১ কোটি, চিকিৎসায় ৩১ কোটি, বিবাহ ঋণে ১৬ কোটি, জমি ক্রয়ে ৫১১ কোটি, বেতনের বিপরীতে এক হাজার ২৫৬ কোটি এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে এক হাজার ৪৯১ কোটি টাকায়। মেয়াদি আমানতের বিপরীতে ঋণ বৃদ্ধি হয়েছে এক হাজার ১৫১ কোটি এবং স্থায়ী আমানতের বিপরীতে দুই হাজার ৬৯২ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোক্তা ঋণের এই তীব্র বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য উভয়প্রভাব ফেলে। একদিকে এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় এবং বাজারে চাহিদা জাগায়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে উচ্চ সুদে ঋণ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষত মূল্যস্ফীতির প্রভাব এবং মানুষের দৈনন্দিন ক্রয়ব্যবস্থার উপর ঋণের বোঝা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভোক্তা ঋণ বৃদ্ধির এই চিত্র আগামী অর্থনৈতিক নীতিমালা ও ব্যাংকিং খাতের দিকনির্দেশনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়ন না হলে, ঋণ অতিভার এবং আর্থিক ঝুঁকির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর ঋণের চাপ বাড়লে এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।