হামাসমুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন’ গঠনের প্রস্তাব পাশ জাতিসংঘে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
হামাসমুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন’ গঠনের প্রস্তাব পাশ জাতিসংঘে

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে গতকাল নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দীর্ঘদিনের আলোচিত দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে বিপুল ভোটে অনুমোদন পেয়েছে একটি প্রস্তাব, যেখানে ‘হামাসমুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন’ গঠনের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান চেয়ে আসছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে উদ্যোগগুলো ভেস্তে গেছে। এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাশ হওয়া প্রস্তাবকে অনেকেই অভিহিত করছেন ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে।

গত শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪২টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় মাত্র ১০টি দেশ, যার মধ্যে ইসরাইলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। এছাড়া ১২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। তাদের উদ্যোগকেই ‘নিউইয়র্ক ঘোষণা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলের ওপর হওয়া হামলা যেমন নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য, তেমনি এর জবাবে গাজায় ইসরাইলি সেনাদের নির্বিচার বোমাবর্ষণ, দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ এবং অনাহার সৃষ্টি করার ঘটনাগুলোও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই প্রস্তাবের মাধ্যমে একদিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞকেও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ঘোষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, এখনই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে। ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ইসরাইলকেও নিরাপদ সীমান্তের ভেতরে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

কিন্তু ইসরাইল আগের মতোই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ভোটাভুটির আগের দিনই দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, ফিলিস্তিন কখনোই স্বাধীন রাষ্ট্র হবে না। তার বক্তব্যে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয় ইসরাইলের অনমনীয় অবস্থান। ভোটের পর ইসরাইলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টেইন বলেন, “যে প্রস্তাবে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, সেই প্রস্তাবই প্রমাণ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এটি এখন এক ধরনের রাজনৈতিক সার্কাসে পরিণত হয়েছে।”

অন্যদিকে, হামাস প্রস্তাবটিকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের স্বীকৃতি। হামাস বলছে, এটি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে একটি কার্যকর পদক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ। যদিও ইসরাইল হামাসকে সম্পূর্ণ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখছে, তবুও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের প্রভাব অস্বীকার করতে পারছে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিন প্রশ্নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বেশ কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে পারে। এমনটি হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ইসরাইলের ওপর চাপও বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশ সবসময় ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে কণ্ঠ মিলিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল বলছে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আর কোনো বিকল্প নেই। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে কেবল ওই অঞ্চলের মানুষই শান্তি পাবে না, বরং বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতা ফিরবে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ ঘটনাকে বড় করে প্রচার করেছে। রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্ক টাইমস—সবাই এই ভোটাভুটির গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছে। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়, এই ভোট আসলে বিশ্ববাসীর বিবেকের প্রতিফলন। বহুকাল ধরে রক্তাক্ত এই সংঘাতের সমাধান চেয়ে আসছিল মানবসমাজ। এবার হয়তো বাস্তবায়নের পথে কিছুটা হলেও অগ্রগতি হলো।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। বাস্তবে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান কার্যকর করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। অতীতে যেমন বহু প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি, এবারও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ এই ঘোষণাকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন। গাজার অনেক শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত মানুষ জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে স্বাধীনতার পথে প্রথম ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত থাকলে একদিন হয়তো সত্যিই একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ে উঠবে।

অন্যদিকে, ইসরাইলি সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ এখনও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বিপক্ষে। তারা মনে করেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হলে নিরাপত্তা হুমকি আরও বেড়ে যাবে। এ নিয়ে ইসরাইলের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ডানপন্থি দলগুলো নেতানিয়াহুর পক্ষে থাকলেও কিছু উদারপন্থি গোষ্ঠী দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন জানাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির এই টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্য আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব কেবল একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাস এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কতটা অগ্রগতি হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত