বাংলাদেশকে বিনামূল্যে ২০টি রেল ইঞ্জিন দিচ্ছে চীন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১২৬ বার
২৪ অক্টোবর থেকে বন্ধ হচ্ছে অন্যের টিকিটে ট্রেনযাত্রা

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, লোকোমোটিভের সংকট এবং বহরে পুরোনো ইঞ্জিনের আধিক্য যে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে চীনের সদ্য ঘোষিত অনুদান বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। রেল মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, চীন বাংলাদেশকে অনুদান হিসেবে ২০টি আধুনিক মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সরবরাহ করবে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা (১২৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার), যা সম্পূর্ণ অনুদান হিসেবে প্রদান করা হবে।

এ উদ্যোগকে বাংলাদেশের রেল খাতের জন্য যুগান্তকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ বর্তমানে রেলওয়ের বহরে থাকা মিটারগেজ লোকোমোটিভের ৭০ শতাংশেরও বেশি তাদের নকশাগত আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। বহু ইঞ্জিন ৩০ থেকে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত বিকল হয়ে পড়া, মেরামত খরচের বৃদ্ধি, এবং জ্বালানি দক্ষতার ঘাটতি রেলের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

রেল মন্ত্রণালয় ‘চায়না গ্রান্টের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ শীর্ষক প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা চীন দেবে এবং অবশিষ্ট ৪৪ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। শুধু লোকোমোটিভ সরবরাহই নয়, এর সঙ্গে থাকবে প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, যন্ত্রপাতি এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও কারিগরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তরের পাশাপাশি স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে রেলওয়ের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বর্তমানে রেলওয়ের বহরে মোট ৩০৬টি লোকোমোটিভ আছে, যার মধ্যে ১৭৪টি মিটারগেজ ও ১৩২টি ব্রডগেজ। কিন্তু মিটারগেজ ইঞ্জিনের অধিকাংশই তাদের কার্যকরী আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। তথ্য বলছে, ১২৪টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ— অর্থাৎ মোট বহরের প্রায় ৭১ শতাংশ — ইতোমধ্যেই ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলেছে। এর মধ্যে ৬৮টি ইঞ্জিনের বয়স ৪০ বছরের বেশি। এ অবস্থায় রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। পুরোনো নকশার কারণে যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে যা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।

একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী মন্তব্য করেছেন, “এমন পুরোনো ইঞ্জিন সচল রাখা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রেল চলাচলে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটছে, ট্রেন বিলম্ব হচ্ছে এবং জ্বালানি খরচও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। নতুন লোকোমোটিভ ছাড়া রেল খাতের আধুনিকায়ন কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।”

রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তঃনগর ট্রেনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মালবাহী ও লোকাল ট্রেন। এর ফলে শিল্পাঞ্চল ও বন্দর সংযোগেও প্রভাব পড়ছে। ২০২০ সালের ডব্লিউটিট (ওয়ার্কিং টাইম টেবিল) অনুযায়ী, মিটারগেজ রুটে লোকোমোটিভের চাহিদা ছিল ২০৩টি। কিন্তু বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে মাত্র ১৮২টি, অর্থাৎ ২১টির ঘাটতি। বাস্তবে এই ঘাটতি আরও বেশি, কারণ যাত্রী ও মাল পরিবহনের চাহিদা গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।ব্যর্থতা

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রেল খাতের যাত্রী পরিবহন অংশীদারিত্ব ১০ শতাংশ এবং মালবাহী পরিবহন ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ছিল। এজন্য রেলওয়ে মাস্টারপ্লানের প্রথম ধাপে ৭৪টি প্রতিস্থাপনযোগ্য এবং ৩৭টি নতুন লোকোমোটিভ কেনার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১১ সালে ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা অর্থসংকটে বাতিল হয়ে যাওয়ায় রেলওয়েকে পুরোনো বহরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

চীনের দেওয়া ২০টি নতুন লোকোমোটিভ এলে যাত্রী ও মালবাহী উভয় পরিবহনেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এ ইঞ্জিনগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমবে এবং ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা বাড়বে। পাশাপাশি নতুন সেবা চালুর মাধ্যমে রেলওয়ের আয়ের পরিমাণও বাড়বে।

একজন রেল কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, “চীনের এই অনুদান রেল খাতের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। যদিও এটি পূর্ণ চাহিদা মেটাতে পারবে না, তবে সংকট কিছুটা লাঘব হবে। দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।”

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল ২০টি লোকোমোটিভ যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের রেলকে আধুনিক, টেকসই এবং নির্ভরযোগ্য করতে হলে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ উভয় রুটেই নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহে আরও বড় পরিকল্পনা নিতে হবে। বহরের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ইঞ্জিন পুরোনো, সময়মতো প্রতিস্থাপন না করলে কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা দুটোই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

চীনের এই অনুদান একদিকে যেমন রেল খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সহযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতাকেও প্রতিফলিত করছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন লোকোমোটিভ যোগ হলে রেলওয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে, যাত্রী ও মাল পরিবহনের ওপর আস্থা বাড়বে এবং দেশের পরিবহন খাত একটি নতুন গতি পাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আরও ব্যাপক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ ছাড়া রেলের প্রকৃত আধুনিকায়ন সম্ভব নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত