দাম বাড়ায় কমছে স্বর্ণের বিক্রি, গুরুত্ব বাড়ছে বিনিয়োগে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৭ বার
আজকের স্বর্ণের দাম: ১৭ নভেম্বর ২০২৫–এ কমেছে বাজারে**

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

স্বর্ণকে বলা হয় আভিজাত্যের প্রতীক, আবার সঞ্চয়ের নিরাপদ ভরসা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধাতুটি যেন হয়ে উঠেছে সোনার হরিণ। প্রতিদিন দামে নতুন রেকর্ড গড়তে থাকা স্বর্ণ এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে অলংকার হিসেবে এর বিক্রি কমলেও বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব বাড়ছে বহুগুণ। বাজারের অনিশ্চয়তা ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা মানুষকে ভাবাচ্ছে, আর এই শূন্যস্থান পূরণ করছে স্বর্ণ, যাকে এখন বহু মানুষ বিকল্প সঞ্চয়ের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করছেন।

প্রাচীনকাল থেকে স্বর্ণ মানুষের জীবনে শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং সম্পদ সঞ্চয়ের এক ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম। বর্তমানেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় আছে। তবে এখনকার বাস্তবতা হলো—স্বর্ণের দাম এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যে সাধারণ ক্রেতারা সহজে কেনার সুযোগ পাচ্ছেন না। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৪৭ টাকা। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই মানের স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪৩ টাকা। অর্থাৎ সাড়ে ৯ মাসে দাম বেড়েছে সাড়ে ৪৬ হাজার টাকার বেশি। ফলে সাধারণ গ্রাহকরা বলছেন, “স্বর্ণের দাম আকাশছোঁয়া, চাইলে আর কেনা যাচ্ছে না।”

তবে দাম বৃদ্ধিকে অনেকেই দেখছেন নতুন সুযোগ হিসেবে। তাদের মতে, পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করে লাভবান হওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত জানুয়ারির শুরুতে কেনা এক ভরি স্বর্ণ এখন বিক্রি করলে লাভ আসবে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আবার যদি পুরনো স্বর্ণ বিনিময় করে নতুন অলংকার কেনা হয়, তবে প্রযোজ্য অবচয় বাদ দিয়েও ব্যবহারকারীর সম্পদের মূল্য প্রায় ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগ আরও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) বলছে, গত দুই বছরে যারা অলস টাকা স্বর্ণে বিনিয়োগ করেছেন, তারা লাভবান হয়েছেন। হিসাব অনুযায়ী, দুই বছরের ব্যবধানে এক ভরি স্বর্ণে লাভের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৫৬ হাজার থেকে ৬৯ হাজার টাকার মধ্যে। বাজুসের মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, “যারা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তারা অনেকেই স্বর্ণে বিনিয়োগ করে শোরুম বা অন্য কাজে ব্যবহার করেন। তবে এ খাতে বিনিয়োগ সব সময় সবার জন্য সহজ নয়, কারণ দরকার হয় বড় অঙ্কের পুঁজি।”

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ বিনিয়োগের গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণের বেড়ে যাওয়া এবং শিল্পখাতে স্থবিরতার কারণে অনেক সঞ্চয়কারী এখন দ্বিধাগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে স্বর্ণকে তারা নিরাপদ আশ্রয় মনে করছেন। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, “বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণ ক্রয় করতে পারেন, তবে তারা লাভবান হবেন। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তেও সাহায্য করবে এই খাত। তবে বিনিয়োগের আগে আন্তর্জাতিক বাজারের পূর্বাভাস ভালোভাবে দেখা উচিত।”

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম দীর্ঘদিন ধরেই ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন ডলারের শক্তিমত্তা স্বর্ণের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী মাসগুলোতেও স্বর্ণের দাম বাড়তে পারে। তাই যারা বিনিয়োগ করতে চান, তাদের সময় এবং বাজার বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দিতে হবে।

বাংলাদেশে স্বর্ণের ইতিহাসও কম বিস্ময়কর নয়। স্বাধীনতার বছরে ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ১৭০ টাকা। অর্ধশতকের কিছু বেশি সময়ে এসে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকায়। এটি শুধু অর্থনৈতিক রূপান্তরের গল্প নয়, বরং বিশ্ববাজার ও দেশীয় চাহিদার প্রতিফলনও বটে।

তবে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীরা লাভবান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতারা পড়েছেন বিপাকে। বিবাহ, উৎসব কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানে স্বর্ণ কেনা-বেচার যে সাংস্কৃতিক প্রথা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা এখন কমতে শুরু করেছে। অনেকেই বিকল্প হিসেবে রূপা কিংবা কম খরচের ডিজাইন বেছে নিচ্ছেন।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিক্রির গতি আগের মতো নেই। গ্রাহকরা এখন বেশি করে পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করছেন অথবা বিনিময়ের পথ বেছে নিচ্ছেন। ফলে নতুন অলংকার তৈরির চাহিদা কমছে, যা শিল্পখাতে কিছুটা প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের কারণে কাঁচা স্বর্ণের আমদানির পরিমাণ বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণ সব সময় ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ নয়। কারণ, বিশ্ববাজারে দাম কমলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তাই পরিকল্পনা ছাড়া শুধু দাম বাড়ার আশায় বিনিয়োগ করা উচিত নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি এখনো লাভজনক এবং তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প।

সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত অবস্থা তৈরি হয়েছে। অলংকার হিসেবে স্বর্ণ কেনা কঠিন হয়ে উঠছে, অথচ একই সঙ্গে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে এর গুরুত্ব বাড়ছে। ইতিহাস বলে, সময়ের সঙ্গে স্বর্ণের দাম সব সময়ই নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাই অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান সময়টিও সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি অধ্যায় মাত্র।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবাণী হলো—বাজারের ওঠানামা ও আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস আমলে নিয়ে সচেতনভাবে স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যথায় অলংকারের এই ঐতিহ্যবাহী সম্পদ একসময় বিনিয়োগকারীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে যে বাস্তবতা স্পষ্ট, তা হলো—দাম যতই বাড়ুক, স্বর্ণ এখনো সঞ্চয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নিরাপদ আশ্রয়গুলোর একটি, এবং ভবিষ্যতেও এর গুরুত্ব কমার সম্ভাবনা খুবই কম।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত