গাজায় ইসরায়েলি হামলার তীব্রতায় হাজারো ফিলিস্তিনি নগর ছাড়ছেন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
“আগেও গাজা পুনর্গঠিত হয়েছে, এবার আর আশার আলো নেই”

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজা ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় শহর গাজা সিটিতে ইসরায়েলি সেনাদের তীব্র বোমা হামলার পর লাখো ফিলিস্তিনি শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ধাবিত হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই হামলাকে গণহত্যার পর্যায়ে রেকর্ড করেছে, এবং বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার ঢেউ আরও তীব্র হচ্ছে।

আল জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক স্থাপনা, আবাসিক ভবন, সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাচ্ছে। বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের তাণ্ডবের মধ্যে নিরাপদ স্থানে সরানোর চেষ্টা করছেন সাধারণ মানুষ। শহরের উত্তরের অংশ, দক্ষিণের রাফাহ এবং খান ইউনিস এলাকা সহ সবত্রে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে।

হামলার ফলে স্থানান্তরিত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। গাজার সরকারি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১ লাখ ৯০ হাজার নাগরিক পুরোপুরি শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তবে, শহরের কেন্দ্র ও পশ্চিমাঞ্চলে আরও প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ ভিন্ন নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। অনেকেই অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণের আল-মাওয়াসি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে হামলার তীব্রতা তাদের উল্টো পথে ফেরার প্ররোচনা দিয়েছে।

তথ্য অনুসারে, গত মঙ্গলবার একদিনে হামলায় কমপক্ষে ৯১ জন নিহত হয়েছেন। বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্য করে চলমান হামলায় আবাসিক ভবন, মসজিদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব গাজার তুফফাহ এলাকার আইবাকি মসজিদ বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এছাড়া, উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরক বোঝাই রোবট মোতায়েন করা হয়েছে, যা একসাথে একাধিক বাড়ি ধ্বংস করতে সক্ষম।

জাতিসংঘের মহাসচিব এই হামলাকে ভয়াবহ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, গাজার জনগণকে বেসামরিক অবস্থান বজায় রাখতে এবং মানবিক সহায়তা পেতে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবে স্থানীয় অবকাঠামোর ধ্বংস এবং বিমান হামলার তীব্রতার কারণে গাজার মানুষজনের নিরাপদ আশ্রয়ের বিকল্প সীমিত।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক্সে লিখেছেন, “গাজা জ্বলছে। শহরের সড়ক, আশেপাশের এলাকা এবং আবাসিক অংশে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে মানুষ নিজের সামান্য মালপত্র নিয়ে নিরাপত্তার খোঁজে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে।” আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই সহিংসতা কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে, এবং গাজা সিটির নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগের জন্য ইসরায়েলি বাহিনী সময় নিচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার উপকূলীয় এলাকার সরাসরি বোমা হামলার ফলে অনেকেই শহর ছাড়ার সময় আঘাত পেয়ে মারা যাচ্ছেন। বস্তুত, পালানোর সময় গাড়ি, ভ্যান এবং হাতে সামান্য মালপত্র নিয়ে চলাচলরত মানুষদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এতে শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ অসহায় মানুষদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার এই পরিস্থিতি মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে। শহরের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে নাগরিকদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শহরের দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের জন্য সীমিত সম্পদ থাকায় তারা দুর্ভিক্ষ ও সংক্রমণসহ অন্যান্য ঝুঁকির সম্মুখীন।

ইসরায়েলি সেনারা গাজার ভেতরে অগ্রসরমান ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যানবাহন মোতায়েন করেছে। সেনাবাহিনী জানায়, শহরের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে তাদের “কয়েক মাস” সময় লাগবে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিমান হামলার সঙ্গে সঙ্গে স্থল অভিযানও চলছে, যেখানে ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ সহিংসতা বন্ধ করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। তারা বলছে, গাজায় বেসামরিক জনগণকে নিরাপদ আশ্রয় এবং জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এছাড়া, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে খাদ্য, পানি, ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তার অব্যাহত প্রবাহের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা গাজার হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো ও চিকিৎসা সামগ্রীর ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ সীমিত থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে, নিরাপত্তার অভাবে অনেক স্বাস্থ্যকর্মীও কাজ করতে পারছেন না।

গাজার স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, যে সমস্ত এলাকা ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে মানুষজন পুনর্বাসনের জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তারা বলছে, নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরিত হওয়া মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত থাকায় মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় নাগরিকরা বলছেন, শহর ছেড়ে পালানোর সময় তারা কোনোরকম নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। কেউ কেউ দক্ষিণাঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন, তবে সেখানে হামলার আশঙ্কা থেকে আবার উল্টো পথে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এভাবে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি মানুষকে চারপাশের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবনের জন্য লড়াই করতে বাধ্য করছে।

সংক্ষেপে, গাজার তীব্র হামলা ও বেসামরিক জনগণের উপর চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ও স্থল অভিযান মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। শহরের প্রায় প্রতিটি আবাসিক ও বেসরকারি স্থাপনা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। স্থানান্তরিত মানুষদের নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের অভাব, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহের ঘাটতি, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করেছে।

গাজায় এই মুহূর্তের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় মানবিক সংকট। বেসামরিক মানুষদের জীবন রক্ষা, নিরাপদ আশ্রয় প্রদান এবং অব্যাহত ত্রাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করা এখন সময়ের অতি জরুরি দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত