কিম জং উনের নজর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়: উত্তর কোরিয়ার সামরিক ড্রোনে নতুন যুগের প্রস্তুতি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১১২ বার
কিম জং উনের নজর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়: উত্তর কোরিয়ার সামরিক ড্রোনে নতুন যুগের প্রস্তুতি

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন সামরিক আধুনিকীকরণ এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতার সম্প্রসারণকে এখন তার দেশের জন্য ‘শীর্ষ অগ্রাধিকার’ ঘোষণা করেছেন। বিশেষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে তিনি সামরিক ড্রোন এবং নজরদারি ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিম জং উনের এই নির্দেশের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক কৌশলে প্রযুক্তি ও এআই-এর সমন্বয় এখন নতুন মাত্রায় পৌঁছাতে যাচ্ছে।

শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএর সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পিয়ংইয়ংয়ে অবস্থিত আনম্যানড এরোনটিক্যাল টেকনোলজি কমপ্লেক্স পরিদর্শনকালে কিম জং উন ড্রোন ও নজরদারি বিমানের কার্যকারিতা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি ড্রোনের সিরিয়াল উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে জোর দেন। কিম বলেন, এ ধরনের আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি আগামী দিনে দেশটির প্রতিরক্ষা এবং নজরদারি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে।

এAI-ভিত্তিক সামরিক উন্নয়নের এই পদক্ষেপের এক সপ্তাহ আগে কিম নতুন প্রজন্মের সলিড-ফুয়েল রকেট ইঞ্জিনের পরীক্ষা তদারকি করেছিলেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, এই ইঞ্জিন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেশের কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধি করবে। কিমের এই পদক্ষেপগুলি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্রভাব ও সক্ষমতা বৃদ্ধির স্পষ্ট দিক নির্দেশ করছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তির মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক ওয়ারহেডসমৃদ্ধ ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার, নবীন গুপ্তচর স্যাটেলাইট কর্মসূচি এবং প্রায় ১০ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্যের পাশাপাশি রিজার্ভ মিলিয়ে প্রায় ৭০ লাখের বেশি সামরিক সদস্যের উপস্থিতি দেশটির কৌশলগত সক্ষমতা প্রমাণ করে। এছাড়াও, দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫৬ লাখ।

যদিও উত্তর কোরিয়ার এআই সক্ষমতার প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত। স্বাধীন বিশ্লেষণ সংস্থা ৩৮ নর্থের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পিয়ংইয়ং চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সীমিত সহযোগিতার মাধ্যমে এআই গবেষণায় এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে চীনের প্রযুক্তি ও গবেষণার ওপর নির্ভরশীল হয়ে দেশটি এআই খাতে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে।

কিম জং উনের শাসনামলে উত্তর কোরিয়া চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করেছে। গত বছর কিম এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়ে নেয়। যদিও জার্মান গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়াকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র এবং সেনা পাঠানো সত্ত্বেও, বিনিময়ে উত্তর কোরিয়ার হাতে এসেছে মাত্র ৪৫৭ মিলিয়ন থেকে ১.১৯ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সাহায্য। এই সাহায্য মূলত খাদ্য, জ্বালানি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কিছু যুদ্ধবিমান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।

চলতি মাসের শুরুতে কিম বেইজিংয়ে চীনের এবং রাশিয়ার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি উত্তর কোরিয়ার বৈশ্বিক রাজনৈতিক উপস্থিতি জোরদারের কৌশল। কিমের এই পদক্ষেপ এবং বৈঠকগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, উত্তর কোরিয়া এখন কৌশলগত, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক দিক থেকে আরও সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে। বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্র এবং এআই-ভিত্তিক ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয় দেশটিকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কিম জং উনের এআই-ভিত্তিক ড্রোন প্রকল্প শুধু সামরিক আধুনিকীকরণ নয়, বরং গোপন নজরদারি, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা কৌশলকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করবে। এ ধরনের প্রযুক্তি দেশের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাবশালী অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হবে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং প্রতিবেশী দেশগুলো সতর্ক হয়ে উত্তেজনা মোকাবিলার পরিকল্পনা করছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই কিম জং উনের এআই-ভিত্তিক ড্রোন উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর নজর রেখেছেন। তারা মনে করছেন, এ ধরনের প্রযুক্তি আগামী দশকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক নীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

উত্তর কোরিয়ার এআই সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত হলেও, দেশটির সীমিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ প্রকল্প, নতুন প্রজন্মের ড্রোন প্রযুক্তি এবং নজরদারি ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রদর্শন করছে। কিম জং উনের সাম্প্রতিক পরিদর্শন ও ঘোষণার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, সামরিক আধুনিকীকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দেশের নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অবস্থান বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

পরিশেষে, কিম জং উনের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়ার সামরিক আধুনিকীকরণ এবং এআই ভিত্তিক ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন দেশের কৌশলগত ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন মাত্রায় প্রভাবিত করছে। এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে না, বরং পুরো উত্তর-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত