সুদানে নামাজের সময় ভয়াবহ ড্রোন হামলা: মসজিদে নিহত ৭৮ জন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৪ বার
সুদানে নামাজের সময় ভয়াবহ ড্রোন হামলা: মসজিদে নিহত ৭৮ জন

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সুদানের দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশির শহরে ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনায় নতুন করে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার ভোরে নামাজের সময় এক মসজিদে এই হামলা চালানো হয়, যাতে কমপক্ষে ৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং অন্তত ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি এবং স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, এই হামলা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই ডেকে আনেনি, বরং সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধকে আরও ভয়াবহ আকারে রূপান্তরিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে সুদানে সরকারি সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এর মধ্যে সংঘাত চলছে। রাজধানী খার্তুম থেকে শুরু হয়ে এই সংঘাত ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে দারফুর অঞ্চলে, যা ইতিহাসের দিক থেকেও দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য পরিচিত। এল-ফাশির শহরকে ঘিরে এই সংঘাত এখন সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, কারণ এটি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন শেষ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শহরটির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে আরএসএফ ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছে এবং শহরের ভেতরে ও বাইরে হামলা জোরদার করেছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আল-ফাশির শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে আরএসএফ দারফুরের প্রায় পুরো অংশ দখলে নিতে সক্ষম হবে। এ কারণে শহরটির ভেতরে অবস্থান করা তিন লাখেরও বেশি বেসামরিক মানুষ এখন ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা যেন একটি অবরুদ্ধ যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে আটকা পড়ে আছেন, যেখানে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

ইতিমধ্যেই শহরের বাইরে অবস্থিত বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে ভয়াবহ হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাব (এইচআরএল) কর্তৃক প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিবিরটির বড় একটি অংশ এখন আরএসএফের দখলে চলে গেছে। মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করেছেন, এই দখল কেবল সামরিক সাফল্য নয়, বরং তা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

সুদান বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, আরএসএফ সাধারণ জনগণকে প্রতিপক্ষের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশেষত অ-আরব সম্প্রদায়কে তারা নিজেদের শত্রু জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে চিহ্নিত করছে। এর ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সংঘাত ক্রমে জাতিগত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে তা আরও ভয়াবহ গণহত্যায় রূপ নিতে পারে।

জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দখলকৃত এলাকায় আরএসএফ অ-আরব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে। তারা গ্রাম পোড়াচ্ছে, মানুষ হত্যা করছে এবং নারী ও শিশুদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালাচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স জানিয়েছে, আরএসএফ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা আল-ফাশিরকে অ-আরব জনগোষ্ঠীমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে আরএসএফ। তাদের দাবি, তারা কোনো জাতিগত সহিংসতায় জড়িত নয় এবং শুধু শত্রুপক্ষের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করেই আক্রমণ চালায়। তবে মসজিদে নামাজরত মানুষের ওপর ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কারণ, এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলো সরাসরি সাধারণ মানুষ, যারা সেদিন ভোরে নামাজ আদায় করছিলেন।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ড্রোন হামলার ব্যবহার দেখিয়ে দিচ্ছে যে সংঘাত এখন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার সুনির্দিষ্ট টার্গেট হামলার সুযোগ দেয়, কিন্তু মসজিদের মতো ধর্মীয় স্থানে শত শত সাধারণ মানুষকে হত্যার ঘটনা স্পষ্ট করে যে উদ্দেশ্য ছিল ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের সম্প্রদায়কে দুর্বল করা।

বিশ্ব সম্প্রদায়ও এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, মসজিদে নিরীহ মানুষের ওপর এই ধরনের হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধবিধির মারাত্মক লঙ্ঘন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ সুদানে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বাস্তবে সংঘাত থামানোর মতো শক্তিশালী কোনো পদক্ষেপ এখনও দেখা যাচ্ছে না।

সুদানের পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রায় অচিন্তনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যত ভেঙে পড়েছে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে ঠাঁই নিয়েছেন। তাদের অনেকেই না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না এবং শিশুদের শিক্ষা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে, সুদানে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই, আর চলমান সহিংসতার কারণে সাহায্য পৌঁছানোও কঠিন হয়ে উঠেছে। ড্রোন হামলার পর পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে গেছে, কারণ মানুষজন নিজেদের আর কোথাও নিরাপদ ভাবতে পারছেন না।

এই ভয়াবহ ঘটনার প্রভাব সুদানের সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই লাখো শরণার্থী দক্ষিণ সুদান, চাদ এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয় তবে এই অভিবাসন স্রোত পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

সর্বশেষে বলা যায়, সুদানের দারফুর অঞ্চলের এই ড্রোন হামলা কেবল একটি মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ নয়, বরং পুরো সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। নামাজরত নিরীহ মানুষদের লক্ষ্য করে চালানো হামলা প্রমাণ করে দিয়েছে যে যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা কোনো সীমারেখা মানছে না। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে এই মানবিক বিপর্যয় থামানো যাবে এবং সুদানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। বিশ্বের দৃষ্টি যখন ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিবদ্ধ, তখন আফ্রিকার এই দেশে গড়ে ওঠা এক ভয়াবহ মানবিক সংকট হয়তো অচিরেই পুরো বিশ্বকেই নাড়া দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত