প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের দেশ পর্তুগাল। শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেয়। এতে বলা হয়, আগামী রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) পর্তুগাল ফিলিস্তিনকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। জাতিসংঘের আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আগেই এই ঘোষণা কার্যকর হবে বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘোষণা বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফিলিস্তিন দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তবে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশ নানা কারণে সরাসরি অবস্থান নিতে এখনো দ্বিধায় রয়েছে। পর্তুগালের এই সিদ্ধান্তকে তাই মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পর্তুগালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাওলো র্যাঙ্গেল চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সফরের সময়ই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দেশটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাঁর সেই মন্তব্যের পরপরই দেশটির রাজনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। অবশেষে শুক্রবারের ঘোষণার মাধ্যমে সেটি বাস্তব রূপ পেল।
এই সিদ্ধান্তকে শুধু কূটনৈতিক অঙ্গনেই নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের মে মাসে প্রতিবেশী দেশ স্পেন তাদের বামপন্থি সরকারের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। একই সময়ে আয়ারল্যান্ড ও নরওয়েও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। স্পেন তখন অন্যান্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দেশগুলোকে একই পথে হাঁটার আহ্বান জানিয়েছিল। তবে সে সময় পর্তুগাল অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নেয়। অবশেষে এক বছরেরও বেশি সময় পর দেশটি নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপ নিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্যদেশের মধ্যে এখনো সীমিত সংখ্যক দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষত সাবেক কিছু কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, সুইডেন ও সাইপ্রাস ইতোমধ্যেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বৃহত্তর ইউরোপীয় পরিসরে এখনো বিভাজন রয়েছে। অনেক দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল পরিস্থিতির কারণে সরাসরি অবস্থান নিতে চাইছে না।
পর্তুগালের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইইউ–এর অভ্যন্তরে ফিলিস্তিন ইস্যুতে নতুন এক বিতর্ক শুরু হতে পারে। কারণ ইউরোপে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে। কিছু দেশ মনে করে, সরাসরি স্বীকৃতি দিলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার অনেক দেশ মনে করে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে ওই জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের আগে এই ঘোষণাকে অনেকেই কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। কারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিন ইস্যুটি আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, আসন্ন অধিবেশনে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গসহ বেশ কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। যদি তা বাস্তবায়ন হয়, তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দৌড়ে ফিলিস্তিন এক বড় ধাপ অতিক্রম করবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো দৃঢ়। তারা মনে করে, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমেই ফিলিস্তিনকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। একতরফা স্বীকৃতি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্র বারবার সতর্ক করে আসছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি এবং গাজার মানবিক সংকট ইউরোপের অনেক দেশকেই তাদের নীতি পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পর্তুগালের এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা দ্বিমুখীভাবে দেখছেন। একদিকে এটি ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক লড়াইয়ে নতুন গতি আনবে, অন্যদিকে ইইউ–এর অভ্যন্তরে নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপে ডানপন্থি এবং রক্ষণশীল শিবির বরাবরই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়ে অনাগ্রহী। ফলে পর্তুগালের এই সিদ্ধান্ত দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দেবে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অন্যায্য অবস্থার অবসান ঘটাতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের পর বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পর্তুগালের এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী করবে।
তবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান হয়ে যাবে। বরং এটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপকে আরও জটিল করতে পারে। কারণ ইসরায়েল ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা একতরফা স্বীকৃতির বিরোধিতা করে আসছে। তারা মনে করে, এমন সিদ্ধান্তের ফলে আলোচনার পথ কঠিন হয়ে উঠবে। কিন্তু অন্যদলীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দিলে আলোচনার ক্ষেত্র আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। তাই রাজনৈতিক সমাধানের জন্য অন্তত স্বীকৃতির মতো প্রতীকী পদক্ষেপ দরকার।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে পর্তুগালের এই সিদ্ধান্তকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট থেকেও অনেকে বিশ্লেষণ করছেন। বাংলাদেশের মতো দেশ দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছে। মুসলিম বিশ্বে ফিলিস্তিন ইস্যুটি সবসময়ই গভীর আবেগের জায়গা দখল করে আছে। ফলে ইউরোপের দেশগুলো একে একে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পর্তুগালের এই সিদ্ধান্ত শুধু কূটনৈতিক ঘোষণাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতির লড়াইকে আরও জোরালো করে তুলবে। আগামী রবিবার যখন দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, তখন সেটি নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে। একইসঙ্গে বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন সমীকরণও তৈরি হবে, যা হয়তো আগামী কয়েক মাস বা বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।