প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) নগরীর সড়ক ও পরিবহন শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নগরীর চলাচলরত যানবাহন ও পথচারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শনিবার পুলিশ কমিশনারের বরাত দিয়ে নতুন আট দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামী সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ অভিযান শুরু হবে। অভিযান চলাকালীন সময়ে কোনোভাবেই অনুমোদনবিহীন বা কাগজপত্রবিহীন যানবাহন নগরীতে চলাচল করতে পারবে না।
এসএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নগরীর সাধারণ মানুষ যাতে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মুক্ত থাকতে পারে এবং সড়কের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযান চলাকালীন সময়ে পুলিশ নজরদারির পাশাপাশি যানবাহনের কাগজপত্র, লাইসেন্স, সিটবেল্ট, হেলমেট এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রথমত সিলেট মহানগরে কোনো ব্যাটারি চালিত রিকশা রেজিস্ট্রেশনবিহীন বা ভুয়া নম্বর প্লেটযুক্ত যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। এতে রাস্তায় অনুমোদনবিহীন যানবাহনের সংখ্যা কমবে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে আসবে। রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে নগরীর নির্ধারিত স্ট্যান্ডগুলোতে অনুমোদিত সংখ্যার বেশি যানবাহন রাখা যাবে না। অতিরিক্ত যানবাহন রাখলে তা নগরীর চলাচলকে ব্যাহত করবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে।
দ্বিতীয়ত, অনুমোদনবিহীন ও অননুমোদিত স্থানে কোনো ধরনের পার্কিং করা যাবে না। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অনিয়মিত পার্কিং বন্ধ করা হবে। এতে নগরীর মূল সড়ক ও মোড়ে যানজট কমবে এবং জরুরি পরিষেবা ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত পথ নিশ্চিত হবে।
তৃতীয়ত, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী উভয়কেই বাধ্যতামূলকভাবে হেলমেট পরিধান করতে হবে। এটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে নগরীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ এবং প্রশাসন জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই নিয়ম কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করবে।
নির্দেশনার চতুর্থ ধাপে বলা হয়েছে, সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নগরীতে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি প্রবেশ করতে পারবে না। এতে নাগরিকদের চলাচল সহজ হবে এবং সড়কের ক্ষতি কমবে। এ ধরনের বড় যানবাহন যেসব সময় নগরীর ভেতরে চলাচল করে, সেগুলো প্রায়শই যানজট ও দুর্ঘটনার মূল কারণ হয়ে থাকে।
পঞ্চম ধাপে বাস, মিনিবাস, কোচ, কার, মাইক্রোবাস ও হাইয়েসের চালকরা ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির কাগজপত্র এবং সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালাতে পারবে না। পাশাপাশি গাড়ির হেডলাইট, ব্রেক লাইট ও সিগন্যাল লাইট সচল না থাকলে সেই যানবাহন রাস্তায় নামানো যাবে না। এই পদক্ষেপ গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ও রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।
ষষ্ঠ ধাপে বলা হয়েছে, কোনো পরিবহনে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বা অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া যাবে না। নগরীতে যাত্রী ওঠানামা করার ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে হবে। সড়কে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, রাস্তার মাঝখানে গাড়ি পার্কিং বা অন্য কোনো অনিয়ম নগরীর চলাচলকে বিপন্ন করে।
সপ্তম ধাপে নগরীর ভেতরে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং যাত্রী ওঠানামা করা যাবে না। সকল পরিবহন সংস্থাকে স্বীকৃত স্ট্যান্ড ও নির্ধারিত স্থানে যানবাহন রাখতে হবে। এতে শহরের সড়কের ব্যবহার কার্যকর হবে এবং নগরীর চলাচল সুসংগঠিত থাকবে।
অষ্টম ধাপে বলা হয়েছে, নগরীর নাগরিকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এসএমপি অভিযান চলাকালীন সময়ে কোনোরূপ শিথিলতা থাকবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুলিশ কমিশনার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো চালক বা পরিবহন সংস্থা এই নিয়ম অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসএমপি কমিশনারের এই নির্দেশনা নগরীর পরিবহন শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন মহল্লা ও সড়কে অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং অনিয়ম, অনুমোদনবিহীন যানবাহন ও পার্কিংয়ের উপর নজরদারি করা হবে।
সিলেটের সাধারণ নাগরিকরা আশা করছেন, এসএমপির এই পদক্ষেপ নগরীর যানজট কমাবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর হবে। ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকরাও জানিয়েছেন, তারা নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করবেন যাতে নগরীর পরিবহন সুষ্ঠু ও নিরাপদ থাকে।
পরিবহন সেক্টরের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের অভিযান নগরীর পরিবহন ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা বলেন, নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন চলাচল, অননুমোদিত পার্কিং এবং নিরাপত্তা বিধি অমান্য করার কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও যানজট বেড়েছে। এসএমপির নির্দেশনা মেনে সকল যানবাহন নিয়মিত হলে নাগরিকদের চলাচল অনেক সহজ হবে।
নির্দেশনার পাশাপাশি, এসএমপি নগরীর বাস, মিনিবাস, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালক ও মালিকদের সচেতন করার জন্য জনসচেতনতা কার্যক্রমও চালাবে। এতে মানুষ নিয়মকানুন মেনে চলবে এবং নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তারা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং নিয়মনিষ্ঠা বজায় রাখলে নগরীতে দুর্ঘটনা কমবে এবং চলাচল সুবিধাজনক হবে।
এসএমপি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এই অভিযান ধাপে ধাপে শহরের সব গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রুটে বিস্তৃত হবে। অভিযান চলাকালীন সময়ে অনুমোদনবিহীন, কাগজপত্রবিহীন এবং নিরাপত্তা বিধি অমান্যকারী যেকোনো যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নগরীর পরিবহন ব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। এটি শুধু নগরীর যানজট কমাবে না, বরং সড়ক দুর্ঘটনা ও নাগরিক অসুবিধা হ্রাসেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। নাগরিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকরা আশা করছেন, এসএমপির এই অভিযান নগরীর পরিবহন খাতকে আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করবে।