প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেট জেলায় ভারতীয় জুয়া ‘তীর শিলং’-এর বিস্তার আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছানোর পর জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম রবিবার এক লিখিত আদেশে এই জুয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে জেলার সব নাগরিক, ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই খেলার প্রভাব থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক তার আদেশে উল্লেখ করেছেন যে, গত দেড় দশকে সিলেট জেলায় ‘তীর শিলং’ খেলাটি ভয়াবহ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরুতে এটি শুধুমাত্র কিছু সীমিত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে দিনমজুর, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য পেশার মানুষ পর্যন্ত এই জুয়ার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভারতে পাচার হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।
জেলা প্রশাসকের মতে, অনলাইনের মাধ্যমে খেলা পরিচালনা করা হলে মানুষের সম্পৃক্ততা আরও বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধ প্রবণতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। তাই জেলা প্রশাসন এই প্রকার জুয়া নিয়ন্ত্রণে নিতেই ‘তীর শিলং’কে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া মুহূর্ত থেকেই প্রশাসন জানিয়েছে, আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সরকারি আদেশ হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হবে।
সিলেটের বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলার প্রতি আসক্তি কমানোর জন্য স্থানীয় স্কুল ও কলেজগুলোর শিক্ষক-শিক্ষিকারা সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম শুরু করেছেন। পাশাপাশি পুলিশি কার্যক্রমের মাধ্যমে খেলার স্থানগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জেলার সাধারণ জনগণ প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিস্তার লাভ করা ‘তীর শিলং’ জেলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে। কিছু অভিভাবক বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধরনের জুয়ার প্রতি আসক্তি কমানোর জন্য প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন।
স্থানীয় বাণিজ্যিক মহলও এই নিষেধাজ্ঞার প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেহেতু অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থের লেনদেন এই খেলার সঙ্গে জড়িত, তাই নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে কার্যকর করলে অর্থ পাচার ও অর্থনৈতিক অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সিলেট জেলা পুলিশও জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় বিশেষ মনিটরিং কার্যক্রম শুরু করেছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোলিং কার্যক্রম, রাউন্ডিং এবং অনলাইনের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল ফ্লো ট্র্যাকিং করে খেলার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিটি অভিযোগ মনিটরিং করা হবে এবং যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘তীর শিলং’ জাতীয় জুয়া দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। এই জুয়ার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবার পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। অনেকে ঋণ গ্রহণ করেও এই খেলার লোভে পড়ছে। সম্প্রতি অনলাইনে জুয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামাজিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক কলহের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই নয়, বরং জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশাসনের নির্দেশনার পরই জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে। এতে মানুষকে সচেতন করে তোলা হচ্ছে, ‘তীর শিলং’ জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হলে আইনগত এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সাংবাদিকদের জানান, “আমরা লক্ষ্য করেছি যে, দীর্ঘদিন ধরে সিলেটে ‘তীর শিলং’ খেলার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে আকৃষ্ট হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। তাই এই খেলাকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। আমরা আশা করি, জনগণ এই নিষেধাজ্ঞার প্রতি সম্মান দেখাবে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।”
স্থানীয় পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ নজরদারি চলছে। যারা এই খেলার সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া অনলাইনে এ খেলার প্রচার বা লেনদেনে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে সিলেটে ‘তীর শিলং’-এর মতো জুয়ার বিস্তার সমাজে একটি সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পারিবারিক জীবন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এই ধরনের জুয়ার প্রভাব ছিল গভীর। জেলা প্রশাসকের পদক্ষেপ সেই ধারা বন্ধ করতে সহায়ক হবে।
সিলেটের সাধারণ মানুষও এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে এই ধরনের খেলার প্রভাব থেকে রক্ষা করা জরুরি। অভিভাবকরা আশ্বাস দিয়েছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলে পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে এবং সমাজে আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক ক্লাস, সেমিনার এবং কর্মশালার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধরনের জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সিলেটে ভারতীয় জুয়া ‘তীর শিলং’-এর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এক গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি শুধুমাত্র আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ নয়, বরং সমাজ ও অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যও প্রাসঙ্গিক। জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপ জেলার মানুষকে সতর্ক করতে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আশা করা হচ্ছে, সিলেটের সাধারণ জনগণ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই ধরনের জুয়ার ফাঁদ থেকে মুক্ত থাকবে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক হবে।