ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি: নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কে নির্ধারণ করবে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১২২ বার
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি: নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কে নির্ধারণ করবে?

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রশ্নে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব কূটনীতিতে। কয়েক দশক ধরে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে এ মাসেই যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ফ্রান্স, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এবং বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। নতুন এ স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের কূটনৈতিক শক্তিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তবে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই রাষ্ট্রটিকে আসলে কে পরিচালনা করবে এবং কার্যকর নেতৃত্ব কোথা থেকে আসবে?

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে সাম্প্রতিক এক আলোচনায় ফিলিস্তিনি কূটনীতিক হুসাম জোমলট সতর্ক করে বলেন, ‘‘নিউইয়র্কে যা ঘটতে যাচ্ছে, তা হয়তো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের শেষ প্রচেষ্টা হতে পারে। এটি ব্যর্থ হলে পুরো অঞ্চলের শান্তির সম্ভাবনা ভেঙে পড়বে।’’ জোমলটের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে এই মুহূর্তে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন—দুটোই কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। ইসরাইল ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, আর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক শর্তগুলোই পূরণ করতে পারছে না।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের জন্য চারটি মৌলিক মানদণ্ড রয়েছে—স্থায়ী জনসংখ্যা, নির্ধারিত ভূখণ্ড, কার্যকর সরকার এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সক্ষমতা। ফিলিস্তিন ন্যূনতম দুটি ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। তাদের রয়েছে স্থায়ী জনসংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের সক্ষমতা, যার প্রমাণ হলো বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি ও জাতিসংঘে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা। কিন্তু ভূখণ্ড এবং কার্যকর সরকারের প্রশ্নে তারা এখনো চরম সংকটে।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা দখল করার পর থেকেই ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড প্রশ্নে জটিলতা শুরু হয়। পশ্চিম তীরের বড় অংশ আজও ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণে। পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনিদের কাঙ্ক্ষিত রাজধানী কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর গাজা—২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর থেকে প্রায় দুই বছরের যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত।

রাষ্ট্রের আরেকটি শর্ত হলো কার্যকর সরকার। কিন্তু এ জায়গাটিতেই ফিলিস্তিন সবচেয়ে বেশি ভুগছে। ১৯৯৪ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) পশ্চিম তীরের একটি অংশে সীমিত শাসন পরিচালনা করলেও গাজায় ক্ষমতা পুরোপুরি হামাসের হাতে। ২০০৭ সালে হামাস ও ফাতাহর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড কার্যত দুটি পৃথক সরকারের অধীনে রয়েছে। মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ করে, আর গাজায় শাসন করে হামাস।

এই বিভাজন আজ ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। এর ফলে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেছে। সর্বশেষ নির্বাচনের আয়োজন হয়েছিল ২০০৬ সালে, যার মানে হলো আজকের তরুণ প্রজন্ম—যাদের বয়স ৩৬ বছরের নিচে—কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ফিলিস্তিনের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব এবং অকার্যকর শাসন ব্যবস্থার কারণে মানুষ তাদের নেতৃত্ব নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে এক ব্যক্তিত্বের নাম বারবার উচ্চারিত হচ্ছে—মারওয়ান বারঘৌতি। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই নেতা ২০০২ সাল থেকে ইসরাইলি কারাগারে বন্দী। তবুও জরিপগুলো বলছে, আজ নির্বাচনের আয়োজন হলে বারঘৌতিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেবে অর্ধেকেরও বেশি ফিলিস্তিনি। আব্বাসের প্রতি সমর্থন এর তুলনায় অনেক কম। ফলে বারঘৌতি ফিলিস্তিনি রাজনীতির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হলেও তার বন্দিত্ব নেতৃত্ব সংকটকে আরও গভীর করছে।

অন্যদিকে ইসরাইলি নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই মেনে নেবে না। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ২০২৪ সালে বলেছিলেন, ‘‘আমি সেই ব্যক্তি, যিনি কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি।’’ সম্প্রতি ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরকে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন বসতি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে তারা কার্যত দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

গাজার যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতায় হামাসও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে তাদের শাসন ত্যাগ করার জন্য। ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে হওয়া এক সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘‘হামাসকে গাজায় তাদের শাসনের অবসান ঘটাতে হবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র হস্তান্তর করতে হবে।’’ আরব রাষ্ট্রগুলোও এই দাবির প্রতি একমত হয়েছে। হামাস পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে যে তারা গাজার শাসন একটি টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।

তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেবল প্রতীকী হলে তার মূল্য সীমিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। লন্ডনের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধুমাত্র স্বীকৃতি নয়, বরং গাজা ও পশ্চিম তীরকে একীভূত করা, নির্বাচন আয়োজন এবং কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘে গৃহীত ‘‘নিউ ইয়র্ক ঘোষণাপত্র’’তেও এ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু পরিস্থিতি বাস্তবে জটিল। ইসরাইল প্রতিশোধ হিসেবে পশ্চিম তীরের কিছু অংশ সংযুক্ত করার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও এখনো ফিলিস্তিন স্বীকৃতির বিপক্ষে অবস্থান করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন যে তিনি এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে একমত নন এবং তার প্রশাসন ‘‘রিভেরা পরিকল্পনা’’ বাস্তবায়নে অটল। এ পরিকল্পনায় গাজার দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকবে, অথচ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো উল্লেখ নেই।

সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের এই আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা কি কেবল রাজনৈতিক প্রতীকই হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আনবে? ফিলিস্তিনি আইনজীবী ডায়ানা বাট্টুর মতে, ‘‘স্বীকৃতির গুরুত্ব আছে, তবে সবচেয়ে জরুরি হলো হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা। আমাদের এখন প্রয়োজন শান্তি, কার্যকর নেতৃত্ব ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের পথ খুঁজে বের করা।’’

ফিলিস্তিনের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন নিঃসন্দেহে বাড়ছে। কিন্তু ভূখণ্ডের বিভাজন, নেতৃত্ব সংকট, ইসরাইলি বিরোধিতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—সবকিছু মিলে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে: স্বীকৃত একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করবে কে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত